উত্তর কোরিয়া ও চীনের মধ্যে নতুন সেতু চালু, নিষেধাজ্ঞা এড়াবেন কিম?

অনলাইন ডেস্ক

বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়া অবশেষে তার সীমান্ত পেরিয়ে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের নতুন একটি পথ পেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে নির্মিত বহুল আলোচিত ‘নিউ ইয়ালু রিভার ব্রিজ’ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে।

চার লেনের এই ব্যস্ত সেতুটি উত্তর কোরিয়াকে তার সবচেয়ে নিকটতম মিত্র এবং প্রধান বাণিজ্য অংশীদার চীনের সাথে সরাসরি যুক্ত করেছে। গত বৃহস্পতিবার সেতুটি উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। তবে এ সুবিশাল অবকাঠামো চালু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মনে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতে, পিয়ংইয়ং তার পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিতে এখন থেকে এই সেতুকে একটি সহজ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

প্রায় দুই মাইল দীর্ঘ এই নতুন সেতুটি চীনের সীমান্ত শহর দানদংয়ের সাথে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজুকে যুক্ত করেছে। যদিও ১২ বছর আগে ২০১৪ সালেই সেতুটির মূল নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছিল, তবুও উত্তর কোরিয়ার অংশের সংযোগ সড়ক এবং প্রয়োজনীয় সীমান্ত তল্লাশি ও কাস্টমস অবকাঠামো অসম্পূর্ণ থাকায় এটি দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। কিন্তু সম্প্রতি গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এই মাসের শুরুর দিকে ধারণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দানদং ও সিনুইজুকে সংযোগকারী ওই সেতুতে বেশ কিছু যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়।

উল্লেখ্য, এই দুটি সীমান্ত শহর দিয়েই চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার মোট দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়ে থাকে। বৃহস্পতিবার আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উভয় দেশের জাতীয় পাতাকায় সজ্জিত বহুসংখ্যক ট্রাক অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে নদী পার হয়ে যাতায়াত করতে দেখা গেছে।

এর আগে ১৯৩৭ সালে নির্মিত ‘সিনো-কোরিয়ান ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’টিই ছিল দুই দেশের মূল যাতায়াত মাধ্যম, যা দানদংয়েই অবস্থিত। তবে পুরনো এই সেতুটি মাত্র এক লেনের হওয়ায় সেখানে একবারে কেবল একমুখী যানবাহন চলাচল করতে পারত, যা আধুনিক বাণিজ্যের বিপুল চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছিল। দীর্ঘদিনের বিলম্ব কাটিয়ে নতুন এই সুবিশাল সেতুটির উদ্বোধন বেইজিং ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক নৈকট্যের কথাই জানান দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় দৃশ্যমান মাত্রায় উন্নত হতে শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত মার্চ মাসে উভয় দেশের মধ্যে বন্ধ থাকা রেল যোগাযোগ পুনরায় চালু করা হয় এবং জুনে চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং উত্তর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়ং সফরে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হন।

কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়ার সাথে উত্তর কোরিয়ার অভূতপূর্ব সামরিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির কারণে চীনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব কিছুটা তৈরি হয়েছিল। তবে শি-কিম শীর্ষ বৈঠকটি দুই কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এই প্রসঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার কিউংনাম বিশ্ববিদ্যায়লয়ের উত্তর কোরিয়া বিষয়ক প্রখ্যাত অধ্যাপক লিম উল-চুল মন্তব্য করেছেন যে, এই সেতু চালুর মাধ্যমে চীন ও উত্তর কোরিয়া বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনর্বহাল এবং কৌশলগত জোটবদ্ধতার একটি শক্তিশালী বার্তা প্রদর্শনের চমৎকার সুযোগ পেয়েছে।

বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখনো উত্তর কোরিয়ার মোট আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীনের সাথে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বার্তা সংস্থা এপি-র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে চীন ও উত্তর কোরিয়াকে যুক্তকারী মোট ১৭টি রেল ও সড়ক সংযোগ পথ বিদ্যমান রয়েছে। কূটনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে উত্তর কোরিয়া গত মাসে রাশিয়ার সাথেও নিজেদের সংযোগকারী প্রথম সড়ক সেতুটির উদ্বোধন করেছে। এদিকে নতুন এই চার লেনের সেতু চালু হওয়ার বিষয়ে অগ্রিম প্রতিক্রিয়া জানিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নতুন চালু হওয়া এই সেতুটি দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক লেনদেনের পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণের মধ্যকার যোগাযোগ ও বিনিময়কে আরও গতিশীল করবে, যা উভয় দেশের আপামর সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করতে সহায়ক হবে।

তবে চীন ইতিবাচক সম্ভাবনার কথা বললেও বিশ্ব সম্প্রদায়ের বড় একটি অংশ এবং আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বিষযটিকে মোটেও সাধারণ হিসেবে দেখছেন না। তাদের তীব্র আশঙ্কা, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞা আরোপিত দেশগুলোর একটি উত্তর কোরিয়া এই সেতুকে কাজে লাগিয়ে কাঁচামাল, খনিজ সম্পদ ও অন্যান্য নিষিদ্ধ পণ্যের রপ্তানি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ অনায়াসে এড়িয়ে যেতে পারবে।

সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights