প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাবে গরমিল

ইমরান চৌধুরী

কাপ্তাই হ্রদে মাছের উৎপাদন বাড়ানো, আহরণ-পরবর্তী অপচয় কমানো এবং মৎস্যসম্পদের ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে প্রায় ৮০ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগেই এর ব্যয়, জনবল, যন্ত্রপাতি, যানবাহন কেনাকাটাসহ বিভিন্ন প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। তিনজন জনবলের জন্য পাঁচজনের অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় নির্ধারণ, ৫০ মাসের প্রকল্পে বিভিন্ন খাতে ৫১ মাসের ব্যয় প্রস্তাব এবং প্রয়োজনীয়তা যাচাই ছাড়াই বিপুলসংখ্যক সরঞ্জাম ও যানবাহন কেনার প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি উঠেছে। এ ছাড়া প্রকল্পের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ঘাটতিও চিহ্নিত করেছে কমিশন। ‘কাপ্তাই লেকে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)। প্রকল্পটির উদ্যোক্তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের মে থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত। প্রকল্পটি এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদন পায়নি। পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভার কার্যপত্রে প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা নিয়ে এসব পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

ব্যয়ের হিসাবেই অসংগতি : প্রকল্পের ব্যয়ের সারসংক্ষেপ ও নির্ধারিত ছক যথাযথভাবে প্রস্তুত না হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পে তিনজন জনবলের কথা উল্লেখ থাকলেও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ ব্যয় ধরা হয়েছে পাঁচজনের জন্য। একইভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ৫০ মাস নির্ধারণ করা হলেও আপ্যায়ন, মুদ্রণ ও বাঁধাই, মিনিবারি, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ খরচের হিসাব করা হয়েছে ৫১ মাসের জন্য। এ ছাড়া ৫১ সেট টেলিফোন ও ইন্টারকম কেনার প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নিয়েও সভায় আলোচনার কথা বলা হয়েছে। আসবাব, অফিস সরঞ্জাম, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ার কেনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন। প্রকল্পে নতুন কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রজেক্টর ও ফটোকপি মেশিন কেনার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান যন্ত্রপাতি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ও ধরা হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি কেনার পাশাপাশি পুরোনো যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করতে বলেছে কমিশন।

বোট কেনার প্রস্তাবেও প্রশ্ন : প্রকল্পে যানবাহন ও নৌযান কেনা এবং মেরামতের প্রস্তাব নিয়েও বিস্তারিত পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি স্পিডবোট ভাড়ার সুপারিশ করা হলেও প্রকল্পের আওতায় চুক্তিভিত্তিক দুটি যানবাহন ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি পাঁচটি মোটরযানবাহী বোট মেরামত এবং নতুন তিনটি ফাইবারবোট কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৩০টি ফাইবারবোট এবং তিনটি মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাবের বিষয়টিও পিইসি সভায় আলোচনার জন্য তোলা হয়েছে। এসব যানবাহন ও সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা এবং প্রস্তাবিত ব্যয়ের যৌক্তিকতা সম্পর্কে কার্যপত্রে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) মীর হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রকল্পটির প্রাথমিক ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছিল। পিইসি সভায় প্রকল্পের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করতে বলা হয়েছে। কিছু খরচের বিষয়ে নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবে মাত্র তিনজন কর্মকর্তার কথা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এতে আরও অনেক জনবল কাজ করবে। ফলে শুধু ওই তিনজনের ভ্রমণ ব্যয়ের কথা উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে হলে আমাকে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দেখে বলতে হবে।’ কাপ্তাই হ্রদে মাছ আহরণ-পরবর্তী অপচয় কমানো, উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নত মানের পোনা সংরক্ষণ এবং মাছের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করাই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি মাছ আহরণ, অবতরণ, প্যাকেজিং ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে পরিকল্পনা কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ভিত্তিতথ্য ও সুনির্দিষ্ট ডেটাবেসের ঘাটতি রয়েছে। মাছের উৎপাদন কতটা বাড়বে, আহরণ-পরবর্তী অপচয় কতটা কমবে এবং স্থানীয় কর্মসংস্থানে কী পরিমাণ পরিবর্তন আসবে এসব বিষয়ে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। জিডিপিতে প্রকল্পের অবদানের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রাও সংযুক্ত না থাকায় বিষয়গুলো নিয়ে সভায় আলোচনার কথা বলা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights