চুয়েটের সংকট নিরসনে কমিটি, নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি

প্রায় এক মাস ধরে অচল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। তবে সংকট নিরসনে গঠিত এ কমিটিতে চুয়েটের কোনো শিক্ষক বা প্রতিনিধিকে রাখা হয়নি। এমনকি এর আগে অনুষ্ঠিত জরুরি সিন্ডিকেট সভাতেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি অংশ নেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সংকট সমাধানে কমিটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে ছয় সদস্যের পরামর্শক কমিটি গঠন করে ইউজিসি। কমিটিতে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ-আল-মামুনকে আহ্বায়ক এবং অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মহিবুল আহসানকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) উপাচার্য এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী।

কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুবুল হক পাটোয়ারী বলেন, চুয়েটের চলমান অচলাবস্থা নিরসন এবং শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়াই এ কমিটির মূল লক্ষ্য।

তবে কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক সামিউন বাসির বলেন, ‘চুয়েটের সমস্যা নিরসনে গঠিত কমিটিতে চুয়েটেরই কেউ নেই। এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, যে সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে, সেই সভাতেও চুয়েটের কেউ অংশগ্রহণ করেননি। তাহলে কীভাবে সংকট নিরসন হবে?’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরাও কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ছাড়া সংকট নিরসনের উদ্যোগ কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কম। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।

শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘চুয়েটের প্রতিনিধি ছাড়া সংকট নিরসনের উদ্যোগ অনেকটা হাস্যকর। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচি চলবে। পূজার ছুটির পর আবারও সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি পালন করা হবে।’

জানা যায়, গত ২১ সেপ্টেম্বর চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও কর্মবিরতি এবং অসহযোগ কর্মসূচি পালন করে আসছেন। আন্দোলনের কারণে প্রায় এক মাস ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও ব্যবহারিক পাঠদানসহ সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে।

এর মধ্যে গত ১২ অক্টোবর সকালে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে তালা ভেঙে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। পরে তাঁকে ভেতরে রেখেই প্রশাসনিক ভবনের ফটকে তালা দেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

পরদিন ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় প্রায় ৩৪ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৫ অক্টোবর তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ফিরে গেলেও পরদিন সকালে সেখান থেকে চলে যান।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নবনিযুক্ত উপাচার্য অনলাইনে চুয়েটের ১৪৫তম জরুরি সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করেন। ১৫ সদস্যের সিন্ডিকেটের মধ্যে মাত্র ছয়জন সভায় অংশ নেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সভায় চুয়েটের কোনো শিক্ষক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।

এরপর ১৮ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ থেকে পাঠানো এক চিঠিতে চুয়েটের চলমান সংকট নিরসন এবং ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালুর লক্ষ্যে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পরামর্শক কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়।

ওই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে ইউজিসি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব কোনো প্রতিনিধি না থাকায় এ উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কতটা কাটবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights