ট্রাম্পের দূতের রাশিয়া সফর, চার বছর পর মুক্তি পেলেন মার্কিন বন্দি

অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়ায় চার বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি থাকা ৭৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সেন্ট পিটার্সবার্গ সফরের পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয় বলে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের বাসিন্দা। ইউক্রেনে ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে লড়াই করার অভিযোগে তাকে কারাবন্দি করা হয়েছিল। তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর তাকে অন্যায়ভাবে আটক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।

মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনায় তিনি হাবার্ডের বিষয়টি তুলেছেন। পরে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর হাবার্ডের মুক্তির জন্য রুশ প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান মার্কিন বিশেষ দূত উইটকফ।

উইটকফের মস্কো সফরের আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, তার এই সফরে অন্যায়ভাবে আটক মার্কিন নাগরিক হাবার্ডের মুক্তি নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অব্যাহত অঙ্গীকারেরই প্রতিফলন এই উদ্যোগ।

ইউক্রেনের ইজিউমে বসবাস করতেন হাবার্ড
স্টিফেন হাবার্ড দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বিদেশে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৪ সালে তিনি পূর্ব ইউক্রেনের ইজিউম শহরে বসবাস শুরু করেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর শহরটি রুশ বাহিনীর দখলে চলে যায়।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, রুশ কৌঁসুলিদের অভিযোগ ছিল, মাসে প্রায় এক হাজার ডলারের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হয়ে হাবার্ড ইজিউমে ইউক্রেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

তবে হাবার্ডের বোন প্যাট্রিসিয়া হাবার্ড ফক্স এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, এটি মিথ্যা।

হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বন্দিবিনিময় এবং আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির প্রচেষ্টা আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে তার মুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত শর্ত বা কোনও বন্দিবিনিময় চুক্তি হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে প্রতিবেদনে কিছু জানানো হয়নি।

রাশিয়ার কারাগারে এখনও বন্দি অন্য মার্কিন নাগরিকেরা
হাবার্ডের মুক্তির আগে গত আগস্টে রাশিয়ার হেফাজত থেকে মুক্তি পান মার্কিন নাগরিক রবার্ট গিলম্যান। গুরুতর স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের মধ্যে মানবিক কারণে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার সময় বিশেষ চিকিৎসা-সুবিধাসম্পন্ন বিমানে করে নিয়ে আসা গিলম্যানকে অত্যন্ত শীর্ণ অবস্থায় দেখা যায়। তার মুক্তির দাবিতে কাজ করা একটি সংগঠনের অভিযোগ, রাশিয়ার কারাগারে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল।

তবে হাবার্ড ও গিলম্যানের মুক্তির পরও রাশিয়ায় বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিক বন্দি রয়েছেন।

আন্দ্রে খাচাতুরিয়ান: ২০২১ সালে আটক হন তিনি। অস্ত্র পাচারের অভিযোগে তাকে সাড়ে আট বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। আর্মেনীয় বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নাগরিক যুক্তরাষ্ট্র থেকে মস্কো হয়ে আর্মেনিয়া যাওয়ার পথে গ্রেফতার হন।

ডেভিড বার্নস: ২০২২ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। মার্কিন নাগরিকদের জিম্মি ও অন্যায়ভাবে আটক হওয়ার ঘটনা নিয়ে কাজ করা ফোলি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তার সাবেক স্ত্রী টেক্সাস থেকে তাদের দুই ছেলেকে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার পর নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন। ফাউন্ডেশনটির দাবি, টেক্সাসের কর্মকর্তারা আগেই দু’বার ওই অভিযোগ খারিজ করেছিলেন।

আলেকসান্দার আন্তোনভ: সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে শরণার্থী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর তিনি দেশটির নাগরিকত্ব লাভ করেন। ২০২৫ সালে রাশিয়া থেকে এস্তোনিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করার সময় তাকে আটক করা হয়। ফোলি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে রাশিয়াবিরোধী মনোভাব পোষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে তাকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

ওলগা জেজলার: যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী বাসিন্দা জেজলারকে ২০২২ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেফতার করে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফোলি ফাউন্ডেশনের দাবি, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত বোনের জন্য বৈধ সিবিডি তেল নিয়ে তিনি রাশিয়ায় যাচ্ছিলেন। কিন্তু রুশ কৌঁসুলিরা ইচ্ছাকৃতভাবে ওই পদার্থকে হাশিশ তেল হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন বলে সংগঠনটির অভিযোগ।

চাক জিমারম্যান: তার সমর্থকদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক সদস্য। আন্তর্জাতিক জলসীমায় নৌযানে চলাচলের সময় রুশ নৌবাহিনী তাকে আটক করে বলে দাবি করা হয়েছে। তার নৌযানে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কারণে অস্ত্র পাচারের অভিযোগ আনা হয়।

অন্যায়ভাবে আটক মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি চায় ওয়াশিংটন
রবার্ট গিলম্যানের মুক্তির পর মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক মুখপাত্র আশা প্রকাশ করেছিলেন, এই ঘটনা রাশিয়ায় অন্যায়ভাবে আটক আরও মার্কিন নাগরিকের মুক্তির পথ তৈরি করবে।

হাবার্ডের মুক্তি ট্রাম্প প্রশাসনের সেই প্রচেষ্টায় আরেকটি অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তার মামলা নিয়ে পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের আলোচনা এবং উইটকফের সফরের পর মুক্তির খবর প্রকাশিত হওয়ায় কূটনৈতিক যোগাযোগের গুরুত্বও সামনে এসেছে।

তবে রাশিয়ায় বন্দি বাকি মার্কিন নাগরিকদের মুক্তি নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে আরও আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। তাদের মুক্তির বিষয়ে নতুন কোনও সমঝোতা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সূত্র: সিএনএন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights