ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহযোগিতা করা দেশগুলোকে তেহরানের কড়া হুঁশিয়ারি
অনলাইন ডেস্ক
পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা কোনো বিভক্ত বিষয় নয় উল্লেখ করে আঞ্চলিক দেশগুলোকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েলের যেকোনো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া বা কোনো ধরনের সহযোগিতা করা কোনো দেশের জন্যই মূল্যহীন হবে না। ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইহুদিবাদী কর্মকর্তাদের নতুন করে সামরিক হুমকি জোরদার হওয়ার প্রেক্ষাপটে তেহরান এই বার্তা বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে।
সম্প্রতি ভারি বোমা ব্যবহার থেকে শুরু করে ইরানকে সম্পূর্ণ খতম করার মতো যুদ্ধংদেহী নানা বক্তব্য দিচ্ছেন মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতি নির্ধারকরা। এসকল বক্তব্য প্রমাণ করে যে, যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলো এখনও ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়। তবে বিগত দশকগুলোর অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে যে, কেবল হুমকি ও সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ওয়াশিংটন কিংবা তেল আবিবের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় বিষয়টি কেবল ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক বা ত্রিপাক্ষিক সামরিক মোকাবিলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক দেশগুলোকেও নিজেদের অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে এখন স্পষ্ট ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা কোনো খণ্ডবিখণ্ড বা বিভক্ত বিষয় হতে পারে না। কোনো সরকার যদি মনে করে তারা নিজেদের মাটি, জলসীমা ও আকাশসীমা প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের জন্য ছেড়ে দেবে এবং নিজেরা তার পরিণতি থেকে সুরক্ষিত থাকবে, তবে সেটি হবে চরম ভুল ধারণা। তেহরানের বার্তা অত্যন্ত পরিষ্কার, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো সামরিক অ্যাডভেঞ্চারে অংশ নিলে তা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না বরং অঞ্চলজুড়ে অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতার আগুন ছড়িয়ে দেওয়ার কারণ হবে।
মার্কিন ও ইসরায়েলি কর্মকর্তারা যখন ইরানকে নিয়ে চাপ বৃদ্ধির কথা বলছেন, তখন উভয় পক্ষই নিজ নিজ দেশে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ও নির্বাচনী উদ্বেগের মুখোমুখি। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক অবস্থান টিকে রাখতে অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে রয়েছেন, অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও আমেরিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রশাসনের গৃহীত নীতির পরিণতি সামলাতে হচ্ছে। যদিও সকল সামরিক হুমকিকে কেবল রাজনৈতিক বা নির্বাচনী সমীকরণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না, তবে সংঘাতের আবহ তৈরি ও শক্তির মহড়া দেওয়া যে দুই দেশের নেতাদের রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অন্যতম হাতিয়ার, তা সামরিক বিশ্লেষণে বিবেচনায় রাখতে হবে।
বাগদাদে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তার মধ্যকার পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমরা হয় একসাথে নিরাপত্তা গড়ে তুলব, নয়তো আমাদের সবাইকে একসাথে নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হতে হবে।
এটি কেবল কূটনৈতিক হুঁশিয়ারি নয় বরং পারস্য উপসাগর ও পশ্চিম এশিয়ার রাজনৈতিক ভূগোলের এক মৌলিক সত্য। ভৌগোলিক অবস্থান, অর্থনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক থেকে এই অঞ্চলের দেশগুলো একে অপরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। যেকোনো ব্যাপক সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন পথ, বিশ্ব জ্বালানি বাজার, বিনিয়োগ, পরিবহন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে। অতএব, কোনো সরকার প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সুযোগ করে দিয়ে নিজে নিরাপদ থাকার আশা করতে পারে না।
যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, তাদের জন্য এই বাস্তবতা সবচেয়ে বেশি প্রযোজ্য। বিদেশি সেনাকে আশ্রয় দেওয়া মানেই সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়া নয়, কিন্তু যদি সেই দেশের মাটি, আকাশসীমা বা অবকাঠামো ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালানো হয়, তবে সেই সিদ্ধান্ত থেকে উদ্ভূত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব ওই দেশকেই বহন করতে হবে। আঞ্চলিক সরকারগুলোকে তাদের সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং সংঘাত উসকে দেওয়ার কর্মকাণ্ডের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে।
ইরানের অন্যান্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও একই সুর ধ্বনিত হয়েছে। দেশটির বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্য মহসেন রেজায়ি মধ্যপ্রাচ্যের আরব ও মুসলিম দেশগুলোকে উদ্দেশ্য করে জায়নবাদী শাসনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক করে বলেছেন যে, অঞ্চলে বিভেদ ও সংঘাত বাড়ানোর প্রকল্পে সঙ্গী হলে তার ভারী মূল্য চুকাতে হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা দুর্বল হলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশেরই লাভ হবে না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা স্বল্পমেয়াদি সুবিধার জন্য যদি প্রতিবেশী দেশগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসে, তবে অঞ্চলে বিদেশি নির্ভরতা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। সেই সাথে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সার্বিক ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামরিক আগ্রাসনে সহায়তাকারী কোম্পানিগুলোকে আর্থিক ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বন্ধ করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তথ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়েও সতর্ক করেছেন। এর মাধ্যমে তেহরান পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, যুদ্ধ সমর্থনের বিষয়টি কেবল ঘাঁটি বা সামরিক সরঞ্জামের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত সুবিধাও নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশের আওতায় আসবে।
সূত্র: মেহের নিউজ
