১৪-১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প পরিচালনা করা কঠিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের স্টিলশিল্প গভীর সংকটে পড়েছে। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্টিলের ব্যবহার কমে যাওয়া, আবাসন খাতে স্থবিরতা, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হারজনিত মূলধন ক্ষয় এবং উচ্চ সুদের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পটির বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ টন হলেও বর্তমানে রডের চাহিদা কমে প্রায় ৫০ লাখ টনে নেমেছে। ফলে কারখানাগুলো গড়ে মাত্র ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছে। এ পরিস্থিতিতে শিল্পটি টিকিয়ে রাখতে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ, স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ, ঋণ পুনর্গঠন এবং নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএমএ) সাধারণ সম্পাদক ও আরআরএম স্টিলের চেয়ারম্যান ড. সুমন চৌধুরী। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, গত দুই বছরে সরকারি প্রকল্পে স্টিলের ব্যবহার প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। আগে দেশে বছরে রডের চাহিদা ছিল ৭০ থেকে ৮০ লাখ টন। বর্তমানে তা কমে প্রায় ৫০ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি নির্মাণকাজও কমেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নীতিগত পরিবর্তনে আবাসন খাতে নিবন্ধন ব্যয়, ভ্যাট ও করের চাপ বাড়ায় বেসরকারি উন্নয়ন কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, উৎপাদন সক্ষমতার অন্তত ৮০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারলে স্টিলশিল্প টেকসইভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে গড়ে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় উৎপাদন করায় প্রতি টনে স্থায়ী ব্যয়ের বোঝা বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বাজারে সেই অনুপাতে দাম বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

মূলধন সংকট ও উচ্চ সুদের চাপ : সুমন চৌধুরী বলেন, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধিতে স্টিলশিল্পের কার্যকরী মূলধনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ডলারের দাম একসময় ৮৫ টাকার আশপাশে থাকলেও পরে তা ১২৫ টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে। সুমন চৌধুরীর হিসাবে, এতে উদ্যোক্তাদের মূলধন প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষয় হয়েছে। আগের সমপরিমাণ ঋণসীমা দিয়ে এখন কম ডলারের কাঁচামাল আমদানি করা যাচ্ছে। অথচ সেই অনুপাতে ব্যাংকঋণের সীমা বাড়েনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণের উচ্চ সুদ। বর্তমানে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে শিল্প পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর কার্যকরী মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে হবে।

গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বাড়াচ্ছে উৎপাদন খরচ : সুমন চৌধুরী বলেন, স্টিলশিল্পে গ্যাসসংকটের তীব্রতা গত তিন মাসে বেড়েছে। কিছু কারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় শূন্যে নেমে আসায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও ব্যাংকঋণের সুদ, কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে এ খাতে ব্যয় প্রায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ বেড়েছে। প্রতি টন রড উৎপাদনে বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। স্টিল উৎপাদনের রূপান্তর ব্যয়ের প্রায় ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ ব্যয় হয় বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানিতে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এতে আমদানি করা স্ক্র্যাপের প্রতি টনে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৪০ ডলার ব্যয় হচ্ছে। বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা পণ্যের দামে সমন্বয় করা না যাওয়ায় উৎপাদকদের মুনাফা কমছে, কোথাও কোথাও লোকসান হচ্ছে।

ঝুঁকিতে কারখানা, কর্মসংস্থান ও ব্যাংকের বিনিয়োগ : সুমন চৌধুরী বলেন, বিএসএমএর সদস্যপ্রতিষ্ঠান প্রায় ৩৯টি। এর মধ্যে বর্তমানে সচল রয়েছে প্রায় ৩২টি। সচল প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সাত থেকে আটটি কারখানা অনিয়মিতভাবে উৎপাদন করছে। তার হিসাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদক কোনো না কোনোভাবে আর্থিক চাপে রয়েছেন। বন্ধ হয়ে যাওয়া বা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়া কারখানার কারণে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২ লাখ মানুষ। এ খাতে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানান তিনি। এর প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে ব্যাংক ঋণ থেকে এবং বাকি ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তাদের নিজস্ব মূলধন। ফলে সংকট দীর্ঘায়িত হলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি ব্যাংকের বিনিয়োগও ঝুঁকিতে পড়বে।

১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিলের দাবি : স্টিলশিল্প পুনরুদ্ধারে সরকারের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চেয়েছেন সুমন চৌধুরী। প্রস্তাবিত প্যাকেজে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকরী মূলধন, স্বল্প সুদে ঋণ, বিদ্যমান ঋণ পুনর্গঠন এবং বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা কারখানা পুনরায় চালুর ব্যবস্থা রাখার দাবি জানিয়েছেন তিনি। সুমন চৌধুরীর প্রস্তাব, মূলধনের ঘাটতি মোকাবিলায় ৪ শতাংশ সুদে ১০ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি ঋণ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি একটি বিশেষ ‘স্টিল ইন্ডাস্ট্রি রিকভারি ফান্ড’ গঠন করা প্রয়োজন। এতে আর্থিক চাপে থাকা কিন্তু পুনরুদ্ধারযোগ্য কারখানাগুলোকে উৎপাদনে ফেরানো সম্ভব হবে।

ভ্যাট-কর নীতিতে স্থিতিশীলতা চান উদ্যোক্তারা : সুমন চৌধুরী বলেন, স্টিল বিক্রির পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের গুঞ্জন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে উদ্যোক্তাদের। বর্তমানে প্রতি টন রডে প্রায় ৩৪০০ টাকা ভ্যাটের যে কাঠামো রয়েছে, তার পরিবর্তে বিক্রয়মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হলে করের বোঝা কয়েক গুণ বেড়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি টন রডের বিক্রয়মূল্য ৮০ হাজার টাকা ধরা হলে তার ১৫ শতাংশ দাঁড়ায় ১২ হাজার টাকা। যদিও প্রকৃত প্রদেয় ভ্যাট ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট ও প্রযোজ্য আইনি বিধানের ওপর নির্ভর করবে, তবু এ ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, স্টিলশিল্পের জন্য স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য ভ্যাট-কর কাঠামো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আবাসন খাতের স্থবিরতা কাটানো, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান রক্ষা করতে হলে সংকট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন সক্ষমতার অব্যবহার, আর্থিক লোকসান ও ঋণঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights