গর্জে উঠুক বাংলাদেশ
রাশেদুর রহমান
ফুটবল বাংলাদেশের প্রাণের খেলা। শহর-বন্দর কিংবা গ্রামগঞ্জ, ফুটবল দেখলেই পথিক দাঁড়িয়ে যায়। উচ্ছ্বাস-আনন্দে মেতে ওঠে। ফুটবলের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। আরও একবার এই আনন্দে মেতে ওঠার অপেক্ষায় আছে বাংলাদেশ। শুরু হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপখ্যাত সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। ছয় দলের লড়াইয়ে ফুটবল উৎসবে মেতে উঠবে দেশ। গর্জে উঠবে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৫তম আসর বসছে বাংলাদেশে। ৫ নভেম্বর ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে শুরু হবে এ প্রতিযোগিতা। ফাইনাল ১৭ নভেম্বর।
স্বাগতিক বাংলাদেশের সঙ্গে অংশ নেবে ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। ফিফা নিষেধাজ্ঞা থাকায় নেপাল এ আসরে খেলতে পারছে না। অংশগ্রহণকারী ছয় দল দুই গ্রুপে লড়াই করবে। ‘এ’ গ্রুপে আছে বাংলাদেশ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা। এ ছাড়া ‘বি’ গ্রুপে লড়াই করবে ভারত, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান। গ্রুপ পর্বের ম্যাচ শেষে দুই গ্রুপের শীর্ষ দুই দল খেলবে সেমিফাইনালে। সব ম্যাচই হবে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়ামে। টেকনো মোবাইলের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠেয় এবারের প্রতিযোগিতার নাম রাখা হয়েছে ‘টেকনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬’। দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) দুই বছর পরপর এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। তবে এবার হচ্ছে তিন বছর পর। শেষবার এ আসর হয়েছিল ২০২৩ সালে ভারতের বেঙ্গালুরুতে। সেবার চ্যাম্পিয়ন হয় স্বাগতিক ভারত। গতবারের ফাইনালে অতিথি দল কুয়েতকে হারিয়েছিল তারা। রেকর্ড নবমবারের মতো সাফ শিরোপা ঘরে তুলেছে ভারত। এবারের আসর শুরু হবে ৫ নভেম্বর। এদিন বেলা সাড়ে ৩টায় পাকিস্তান ও ভারত অলিম্পিক দলের ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে মাঠের লড়াই। একই দিন রাত ৮টায় মুখোমুখি হবে ভুটান ও বাংলাদেশ। স্বাগতিকদের প্রথম ম্যাচটি টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী দিনের দ্বিতীয় খেলা।
এ বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আয়োজক হওয়ার কথা ছিল শ্রীলঙ্কার। শুরুতে প্রতিযোগিতাটি হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। পরে আয়োজকরা একটি নির্দিষ্ট দেশে সব ম্যাচ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন। সে অনুযায়ী শ্রীলঙ্কাকে আয়োজক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। তবে ভেন্যু ব্যবস্থাপনা ও লজিস্টিক জটিলতা, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর প্রস্তুতির জন্য পর্যাপ্ত সময় নিশ্চিত করার বিষয় বিবেচনায় ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে প্রতিযোগিতাটি পিছিয়ে ২০২৬ সালে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়ে আয়োজক হওয়ার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ায় শ্রীলঙ্কা। এরপর গত জানুয়ারিতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত সাফ নির্বাহী কমিটির সভায় বাংলাদেশকে আয়োজক করার সিদ্ধান্ত হয়। শুরুতে ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে ফিফা আসিয়ান কাপে ভারত অতিথি দল হিসেবে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণের কারণে সূচিতে আবারও পরিবর্তন আনতে হয়। আসিয়ান কাপে অংশ নেয় বাংলাদেশও। আসিয়ান কাপের সঙ্গে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের আগের সূচির সংঘাত থাকায় প্রতিযোগিতার সময়সূচি ফের বদলে যায়।
সাফ সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন পরবর্তী সময়ে সূচি পরিবর্তনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত আয়োজক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। ২১ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশকে আয়োজক দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। ঢাকায় ৪ থেকে ১৭ নভেম্বর প্রতিযোগিতা আয়োজনের কথা জানানো হয়েছিল। তবে পরে প্রকাশিত ম্যাচসূচি অনুযায়ী প্রথম খেলা ৫ নভেম্বর এবং ফাইনাল ১৭ নভেম্বর।
এবারের প্রতিযোগিতায় সাফের ছয় সদস্য দেশ অংশ নিচ্ছে। ভারত এবারের আসরে দ্বিতীয় সারির দল পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশটির সিনিয়র দল একই সময়ে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে। সে কারণে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেবে ভারত অলিম্পিক দল। ফলে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন হলেও এবারের আসরে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও দ্বিতীয় সারির দল। অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে এগিয়ে ভারত (১৩৮)। তবে তারা মূল দল না পাঠানোয় এ র্যাঙ্কিং কাজে আসছে না। বাকিদের মধ্যে শীর্ষে আছে মালদ্বীপ (১৭৩)। এরপর র্যাঙ্কিংয়ে আছে বাংলাদেশ (১৮২), শ্রীলঙ্কা (১৮৪), ভুটান (১৯২) ও পাকিস্তান (১৯৮ নম্বরে)। আগের সাফ আসরগুলোয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৩ সালে চ্যাম্পিয়ন হওয়া। ভুটানের সেরা ফল ২০০৮ সালে সেমিফাইনাল। মালদ্বীপ ২০০৮ ও ২০১৮ সালে শিরোপা জিতেছে। পাকিস্তানের সেরা সাফল্য ১৯৯৭ সালে তৃতীয় স্থান। শ্রীলঙ্কা ১৯৯৫ সালে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ভারত ১৪ বারের মধ্যে নয়বারই শিরোপা জিতেছে।
গত ১ আগস্ট ভুটানের থিম্পুতে অনুষ্ঠিত হয় এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ড্র। ২০ জুলাই প্রকাশিত ফিফা পুরুষদের র্যাঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে দলগুলোকে তিনটি পটে ভাগ করে ড্র করা হয়। প্রথম পটে ছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ ও ভারত। দ্বিতীয় পটে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা। তৃতীয় পটে ছিল ভুটান ও পাকিস্তান। ‘এ’ গ্রুপে বাংলাদেশের প্রথম প্রতিপক্ষ ভুটান। ৫ নভেম্বর রাত ৮টায় জাতীয় স্টেডিয়ামে হবে ম্যাচটি। এরপর ৮ নভেম্বর রাত ৮টায় মুখোমুখি হবে শ্রীলঙ্কা ও ভুটান। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ১১ নভেম্বর রাত ৮টায় বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শ্রীলঙ্কা। গ্রুপের তিনটি ম্যাচই হবে একই ভেন্যুতে। ‘বি’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচ ৫ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টায়। মুখোমুখি হবে পাকিস্তান ও ভারত অলিম্পিক দল। ৮ নভেম্বর বিকাল সাড়ে ৩টায় মালদ্বীপ খেলবে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ১১ নভেম্বর একই সময়ে ভারত অলিম্পিক দল ও মালদ্বীপের ম্যাচ দিয়ে শেষ হবে এই গ্রুপের লড়াই।
গ্রুপ পর্ব শেষে ১৪ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে দুটি সেমিফাইনাল। প্রথম সেমিফাইনাল শুরু হবে বিকাল ৩টায়। সেখানে খেলবে ‘বি’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও ‘এ’ গ্রুপের রানার্সআপ। দ্বিতীয় সেমিফাইনাল শুরু হবে রাত সাড়ে ৮টায়। এই ম্যাচে মুখোমুখি হবে ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ। দুটি ম্যাচই হবে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়ামে। দুই সেমিফাইনালের বিজয়ী দল ফাইনালে উঠবে। ১৭ নভেম্বর রাত ৮টায় হবে শিরোপার লড়াই। ফাইনালের ভেন্যুও জাতীয় স্টেডিয়াম। প্রতিযোগিতার সব খেলার সময় বাংলাদেশের স্থানীয় সময় অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে। এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সব ম্যাচ আয়োজনের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম। এ মাঠের গ্যালারির ধারণক্ষমতা ২২ হাজার ৪০০। এক ভেন্যুতে সব ম্যাচ আয়োজনের ফলে দলগুলোর যাতায়াত ও ভেন্যু পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে না।
আয়োজনের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছে একাধিক প্রতিষ্ঠান। সামগ্রিক আয়োজন পরিচালনার দায়িত্বে আছে টিএসএ স্পোর্টস অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট। ম্যাচ কর্মকর্তাদের কিট সরবরাহ করবে হুনকার। টিকিটিং পার্টনার টিকিফাই। আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনায় রয়েছে আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টস। ফুটবল পার্টনার ভেক্টর এক্স এবং পেমেন্ট পার্টনার উপায়। পানীয় পার্টনার হিসেবে আছে মোজো। নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে এলিট ফোর্স। এ ছাড়া স্মার্ট পলিমার, ইউনাইটেড হেলথকেয়ার ও বার্জার পার্টনার হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ সম্প্রচার করবে টি স্পোর্টস। অনলাইন স্ট্রিমিং পার্টনার টফি। পাশাপাশি ওটিটি পার্টনার হিসেবে রয়েছে বঙ্গ বিডি। ভারতের সম্প্রচারক ভেটো এবং পাকিস্তানে ম্যাচ দেখাবে মাইকো মঞ্চ প্রস্তুত। দলগুলোরও প্রস্তুতি শেষের দিকে। এখন কেবল আসল লড়াইয়ের অপেক্ষা।
