জাহাজে হামলায় কৃষ্ণসাগরে অস্থিরতা, ন্যাটোর নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

অনলাইন ডেস্ক

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে কৃষ্ণসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথে। রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে একের পর এক পণ্যবাহী জাহাজে ড্রোন হামলা ও ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মধ্যে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নজরদারি বিমান, রাডার ও ড্রোন মোতায়েন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সামরিক জোটটি। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া নিয়ে ন্যাটোর অবস্থান এখনো সতর্ক।

মঙ্গলবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে ন্যাটোর সদস্য রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার কাছাকাছি বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত সাতটি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত ও ডুবে যাওয়ার পাশাপাশি নাবিকদের প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এতে কৃষ্ণসাগরের বাণিজ্যিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

গত ২৮ অক্টোবর বুলগেরিয়ার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্রিসের মালিকানাধীন ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘কনটশিপ জেট’ তিনটি নৌ-ড্রোনের হামলার শিকার হয়। পরে জাহাজটি ডুবে যায়। তবে জাহাজের সব নাবিককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এর আগে অক্টোবরের বিভিন্ন সময়ে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার উপকূলের কাছে আরও কয়েকটি পণ্যবাহী জাহাজে হামলা হয়। এসব ঘটনায় কয়েকজন নাবিক নিহত হয়েছেন এবং অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

রাশিয়ার দিকে সন্দেহ, অস্বীকার মস্কোর

সামরিক বিশ্লেষকদের অনেকে এসব হামলার জন্য রাশিয়াকে সন্দেহ করছেন। তাঁদের মতে, ইউক্রেনের বন্দর ও রপ্তানি কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি করার পাশাপাশি ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর হয়, তা যাচাই করার কৌশল হিসেবেও হামলাগুলো চালানো হতে পারে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সিদ্ধার্থ কৌশল বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিঃসন্দেহে উত্তেজনা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের কৃষ্ণসাগর কর্মসূচির পরিচালক ইলিয়া জোজার মতে, পশ্চিমা দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে অনিচ্ছুক- এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই হামলাকারীরা ন্যাটোর প্রতিক্রিয়ার সীমা যাচাই করতে পারে।

তবে রাশিয়া প্রতিবেশী দেশগুলোর লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মস্কোর বক্তব্য, ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোই যুদ্ধের বিস্তার ঘটাচ্ছে। রোমানিয়া বেসামরিক জাহাজে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুললেও প্রতিটি ঘটনার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তদন্ত ও প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। বুলগেরিয়াও কয়েকটি হামলার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করলেও সরাসরি দায় নিশ্চিত করেনি।

কৃষ্ণসাগরে ন্যাটোর নজরদারি বাড়ছে

হামলার পর কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নজরদারি জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে ন্যাটো। জোটটি অতিরিক্ত সামুদ্রিক টহল বিমান, রাডারব্যবস্থা ও ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি আকাশপথে আসা ড্রোন শনাক্ত ও প্রতিহত করার সক্ষমতা বাড়াতে সদস্যদেশগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়েছে। ন্যাটোর এক কর্মকর্তা বলেছেন, জোটের সদস্যদেশগুলোর নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকার অটুট। তবে কৃষ্ণসাগরের মতো বিস্তৃত অঞ্চলে সব ধরনের হামলা আগেভাগে শনাক্ত ও প্রতিহত করা সহজ নয়। তুলনামূলক কম খরচে ড্রোন প্রতিরোধের ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। রোমানিয়ার জন্য কৃষ্ণসাগর শুধু বাণিজ্যিক নৌপথ নয়, জ্বালানি নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটির উপকূলের কাছে অবস্থিত নেপতুন ডিপ গ্যাস প্রকল্প চালু হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৃহত্তম গ্যাস উৎপাদক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে রোমানিয়ার। এর কাছাকাছি এলাকায় আগে নৌ-ড্রোন দেখা যাওয়ায় জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেনের খাদ্য রপ্তানিতে চাপ

কৃষ্ণসাগরের অস্থিতিশীলতা ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানিতেও প্রভাব ফেলছে। দেশটির অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ কৃষিপণ্য রপ্তানি। কিন্তু বন্দর ও জাহাজে হামলার ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের বিকল্প নৌপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় বাড়ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে ৩১৭টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। আগের ছয় মাসের তুলনায় এ সংখ্যা চার গুণেরও বেশি। তুরস্কসহ কয়েকটি দেশ কৃষ্ণসাগরে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে সীমিত পরিসরে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছে। তবে রাশিয়া এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেছেন, শস্য পরিবহন ব্যাহত হলে কৃষি ও খাদ্য সরবরাহে বড় সংকট তৈরি হতে পারে।

ন্যাটোর সামনে কঠিন হিসাব

কৃষ্ণসাগরে হামলা বাড়লেও ন্যাটোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- সদস্যদেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যিক নৌপথ সচল রাখা এবং রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপে সামরিক উপস্থিতি পুনর্মূল্যায়নের বিষয়টিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, কৃষ্ণসাগরের নিরাপত্তা দুর্বল হলে শুধু রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া নয়, ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহ, ইউক্রেনের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে ন্যাটোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি কূটনৈতিক উদ্যোগ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

তথ্য সূত্র- রয়টার্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights