সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা সুরক্ষার অনন্য প্রতীক
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
একটি জাতির ইতিহাসে এমন কিছু দিন আসে, যা পথচলার গতি চিরতরে বদলে দেয়। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনি একটি দিন, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিয়েছিল। সে দিনের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ সামরিক অভ্যুত্থান-মাত্র ছিল না। এর তাৎপর্য ছিল অনেক গভীর। এই দিন আমাদের ইতিহাসের বাঁক বদলের কাহিনি লেখা হয়। ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার সম্মিলনে যে অভূতপূর্ব অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল বিক্ষুব্ধ সাধারণ সিপাহি এবং বঞ্চিত জনতার অভূতপূর্ব সম্মিলনের কাহিনি। সেদিন ঢাকা অভিমুখে সিপাহি-জনতার সেই ঐতিহাসিক মিছিল শুধু ক্ষমতার পালা বদলের লড়াই ছিল না, সেটি ছিল বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার বিরুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য গণপ্রতিরোধ। দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়-জাতীয় সংকটকালে ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। সংকট মুহূর্তে জাতি যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে তাহলে যে কোনো সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব।
স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে জটিল এবং ঘটনাবহুল অধ্যায়গুলোর একটি হচ্ছে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর। রাজনৈতিক শূন্যতা, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের সেই ক্রান্তিলগ্নে দেশের স্বাধীনতা যখন চরম হুমকির মুখে, তখন ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয় সিপাহি-জনতা। ক্ষমতার রেষারেষি থেকে দেশকে রক্ষা এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ধারার সূচনা করার লক্ষ্যে যে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তা আজও ইতিহাস বিশ্লেষকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করলেও, ক্ষমতাসীন হয়ে তিনিই রাজনৈতিক অধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা হরণ করেন। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল গঠন করেন। মাত্র চারটি সংবাদপত্র রেখে অবশিষ্ট অন্য সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রক্ষমতা চিরস্থায়ীভাবে কুক্ষিগত করার এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষ ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সপরিবার নিহত হলে দেশ চরম অরাজক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে। সাধারণত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর মধ্যম পর্যায়ের কিছু ক্ষুব্ধ কর্মকর্তা। সামরিক অভ্যুত্থানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হলে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। দেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অভ্যুত্থানকারী সামরিক কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগ নেতা খোন্দকার মোশতাক আহমদকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব প্রদান করেন। অভ্যুত্থানকারী সেনা কর্মকর্তারা গণভবনে অবস্থান করে নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে থাকেন। এতে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশঙ্খলা দেখা দেয়। সেনাবাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ড’ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এমনি এক অবস্থায় ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে পদচ্যুত এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গৃহবন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ সময় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। সেই সময় ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে কার্যত কোনো সরকার ছিল না। রাষ্ট্রপতি পদ থেকে খোন্দকার মোশতাক আহমদকে সরিয়ে দিয়ে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ সময় খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থানের সমর্থনে একটি মিছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের দিকে যায়। সেই মিছিলে খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাই অংশ নেন। তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা সৃষ্টি হয় যে এই অভ্যুত্থানের পেছনে আওয়ামী লীগ এবং ভারতের ভূমিকা রয়েছে। এতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এ সময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এবং তার অনুগত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার নেতা কর্নেল (অব.) আবু তাহের সাধারণ সিপাহিদের মধ্যে জাসদের ১২ দফা দাবির পক্ষে প্রচারণা চালাতে থাকেন। সেনাসদস্যদের বোঝানো হয়, খালেদ মোশাররফের সামরিক অভ্যুত্থান বুর্জোয়া বা ভারতপন্থিদের পুনরুত্থানের প্রচেষ্টামাত্র। সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা কথা বলে সিপাহিদের উত্তেজিত করে তোলা হয়। ৬ নভেম্বর গভীর রাতে অর্থাৎ ৭ নভেম্বর প্রথম প্রহরে সেনানিবাসে সাধারণ সিপাহিরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তাঁরা গুলি ছুড়তে শুরু করেন। বেশ কিছু ঊর্ধ্বতন অফিসারকে হত্যা করা হয়। ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই, সিপাহির উপরে অফিসার নাই’ এমন স্লোগানে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট উত্তপ্ত করে ফেলা হয়। এ সময় সিপাহিরা বন্দিদশা থেকে জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে আনেন। সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে জিয়াউর রহমানের অত্যন্ত জনপ্রিয়তা ছিল। তাঁরা মনে করেছিলেন, জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারবেন। ৩ নভেম্বরের সামরিক অভ্যুত্থানের নায়ক খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমূল হুদা এবং লে. কর্নেল এ টি এম হায়দার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ১০ম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে আশ্রয় নিতে গেলে সেখানেই তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এ সময় অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এমন অনেক সেনা কর্মকর্তার বাসায় আক্রমণ চালানো হয়।
৭ নভেম্বরের পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসে জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি সেনাবাহিনীতে ‘চেইন অব কমান্ড’ ফিরিয়ে আনেন। ৭ নভেম্বরের পর থেকে জিয়াউর রহমান প্রাধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করলে ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ১৯৭৮ সালের ৩ জুন সরাসরি জনগণের ভোটে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। জিয়াউর রহমানের ওপর সিপাহি-জনতার আস্থা ছিল, কারণ তিনি ছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার। তাঁর ব্যক্তিগত সততা ছিল প্রবাদপ্রতিম। এসব কারণে তিনি ছিলেন সিপাহি-জনতার আস্থার প্রতীক। তিনি সেই আস্থার প্রতিদান দিয়েছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। আগেই বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান কোনো সাধারণ সামরিক অভ্যুত্থান ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্রের পরিচয় বদলের একটি দিন। পরবর্তী সময়ে জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে এই অভ্যুত্থানের প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ৭ নভেম্বরের সফল সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিশ্চিত হয়। জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে জাতি হিসেবে আমাদের যে পরিচয় সংকট ছিল, তা দূর হয়। মুক্তবাজার অর্থনীতির ধারা অনুসরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রাথমিক পর্যায়ে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে যৌথ উদ্যোগে সীমিত পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ অবারিত করেন। স্বাধীনতার পর সব উৎপাদন যন্ত্রকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি আর অনিয়মের আখড়ায় পরিণত হয়। এক সময় লাভজনকভাবে পরিচালিত শিল্পকারখানাগুলো অবিরত লোকসান গুনতে থাকে। ৭ নভেম্বরের পর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরে যত সরকার ক্ষমতায় আসীন হয়েছে, কেউই আর বিরাষ্ট্রীয়করণ কার্যক্রম থেকে সরে আসেনি। এতে প্রতীয়মান হয়, জিয়াউর রহমানের বিরাষ্ট্রীয়করণ প্রক্রিয়া কতটা বাস্তবসম্মত এবং সুদূরপ্রসারী ছিল। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমলেই প্রথম বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রপ্তানি শুরু হয়। তাঁর একটি অনন্য কৃর্তি হচ্ছে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) স্থাপন করা। বাংলাদেশের পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে ইপিজেডের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার সন্নিহিত এলাকায় অবস্থিতি দেশগুলোকে একত্রিত করে একটি অর্থনৈতিক জোট গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল- দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। তাঁর সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন হচ্ছে সার্ক। জিয়াউর রহমান সার্ক গঠনের লক্ষ্যে প্রাথমিক যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাঁর অবর্তমানে সেই উদ্যোগ থমকে যায়। পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মেলনে সার্ক গঠন করা হয়। কিন্তু একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র শর্ত দেয় যে, সার্কে কোনো দ্বিপক্ষীয় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা যাবে না। এই শর্ত মেনে নেওয়ার কারণে সার্ক গঠনের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। চল্লিশ বছর আগে সার্ক গঠিত হয়েছে। কিন্তু সদস্যভুক্ত দেশগুলোর উন্নয়নে এই সংস্থা উল্লেখ করার মতো কোনো অবদান রাখতে পারেনি।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় চার মৌলনীতির পরিবর্তন সাধন করেন। ধর্ম নিরপেক্ষতার স্থলে যুক্ত হয় সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির পরিবর্তে মুক্তবাজার অর্থনীতি অনুসরণ করা হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ সংবিধানে যুক্ত করা হয়। একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বাকশালের পরিবর্তে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করা হয়। বিশ্বে মাত্র কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় শাসনভার হাতে পাওয়ার পর স্বেচ্ছায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে জিয়াউর রহমান ছিলেন অন্যতম। তিনি সেনা কর্মকর্তা হয়েও দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। তিনি মনে করতেন, শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণ আবশ্যক।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। স্বাধীনতার পর দেশের পররাষ্ট্রনীতি ছিল ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া ঘেঁষা। জিয়াউর রহমান এই পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে এসে ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটান। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ ইসলামি দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত হচ্ছে জনশক্তি রপ্তানি। জিয়াউর রহমানের সময়ে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছিল। তাঁর সময়ে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চমৎকার দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান মুসলিম দেশগুলোর দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। তিনি ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে প্রশংসিত হন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ভূখণ্ডভিত্তিক বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের একটি বিশেষ তাৎপর্য ছিল। তা হলো পরবর্তী সময়ে আমাদের রাজনীতি শহর থেকে গ্রামে বিস্তৃত হয়। খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ আদালত গঠনের মাধ্যমে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একের পর এক গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছেন পদব্রজে। তিনি কৃষক-শ্রমিকের সঙ্গে মিশেছেন একান্ত আপনজনের মতো। তিনি বলেছিলেন, শহুরের বিলাসবহুল ভবনে বসে গ্রামের মানুষের কল্যাণ চিন্তার দিন শেষ। গ্রামের মানুষের কল্যাণ চিন্তা করতে হলে গ্রামে যেতে হবে। গ্রামের মানুষের সঙ্গে আন্তরিকভাবে মেলামেশা করে তাদের দুঃখকষ্ট জানতে হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি প্রশিক্ষিত পেশাদার বাহিনী। জাতির বিভিন্ন সংকটকালে সেনাবাহিনী জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭৫ সালে সেনাবাহিনী যে পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটায় তার কারণ ছিল বাহিনীর অভ্যন্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং ‘চেইন অব কমান্ড’ নিশ্চিত করা। আর ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের সময় সেনাবাহিনী অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাবাহিনীকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ছাত্র-জনতাকে দমন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সে আদেশ মানতে অস্বীকার করে। তারা দেশের মানুষের ওপর অস্ত্র প্রয়োগের বিরোধিতা করে। ফলে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। সেদিন সেনাবাহিনী যদি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমন করত, তাহলে হয়তো ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হতো। এ জন্য জাতিকে বিরাট মূল্য দিতে হতো। সেনাবাহিনী সেদিন শেখ হাসিনার আদেশ অমান্য করে দেশকে এক মহাবিপদ থেকে রক্ষা করেছিল। বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী প্রতিটি সংকটকালে দেশের জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর যে ঐতিহাসিক সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে তার তাৎপর্য অত্যন্ত গভীরে লুকায়িত। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের বারবার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ৭ নভেম্বরের কোনো বিকল্প নেই। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। চক্রান্তের জাল বিছিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা যতই এগিয়ে আসুক, আমরা যদি বিপ্লবী চেতনা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াই, তাহলে কোনো ষড়যন্ত্রই আমাদের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে পারবে না। এখনো বাংলাদেশকে নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব মোকাবিলা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থ অনেক বড়। তাই সর্বাবস্থায় দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যই আগামী দিনের প্রত্যাশা। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারি তাহলে যে কোনো ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হতে বাধ্য।
♦ লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক রাষ্ট্রদূত। প্রফেসর এমিরিটাস, ঢা.বি.
