টেকনাফে ১৫ অস্ত্রধারী বাহিনীর জিম্মিবাণিজ্য
মুহাম্মদ সেলিম, চট্টগ্রাম ও হাসানুর রশীদ, কক্সবাজার
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে চলতি বছরের মধ্য জানুয়ারি ঘর থেকে বের হয়েছিলেন কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের রহমত উল্লাহসহ ১১ জন। কিন্তু যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা ঘর ছেড়েছিলেন কয়েক দিনের মধ্যে তা ফিকে হয়ে যায়। বিদেশ পাঠানোর নামে তাঁদের করা হয় জিম্মি। চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। এর মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২১ জানুয়ারি রহমত উল্লাহ প্রাণ হারান। ভাগ্যগুণে ১০ জন বাড়ি ফিরে এলেও তাঁরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন দুঃস্মৃতি। এটি বহু ঘটনার একটি খণ্ডচিত্র মাত্র। এরকম শত শত অপহরণ জিম্মিবাণিজ্যে সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ পরিণত হয়েছে নানান অপরাধের স্বর্গরাজ্যে। এ অঞ্চলে ১৫ অপরাধী বাহিনী দিনদিন হয়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্য। তাদের কাছে অপহৃতরা কেবলই ‘গরু’ বা হাতবদলের পণ্য! দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ার আর বাংকার বানিয়ে আধুনিক অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের বাহিনীগুলো। ঝুঁকি কম আর নগদ লাভ বেশি হওয়ায় ইয়াবা ডনেরাই এখন পাহাড়ের এ রক্তক্ষয়ী মানব-বাণিজ্যের মূল হোতা।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন, ‘টেকনাফ এলাকার অপহরণ, ডাকাতি এবং মানব পাচার রোধে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। চিহ্নিত এলাকাগুলোতে টহল জোরদারের পাশাপাশি একটি ক্যাম্পও স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী গঠন করা হয়েছে। এ বাহিনীর অভিযান বর্তমানে চলমান রয়েছে।’
মানব পাচারের আড়ালে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের কথা স্বীকার করে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএমএন সাজেদুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচারের ঘটনা বেড়েছে। মুক্তিপণ আদায়ে নির্যাতনও করা হচ্ছে। যে কোনো অপরাধ দমনে পুলিশ কাজ করছে।
টেকনাফ এলাকার বিগত তিন বছরের পরিসংখ্যান রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য মতে-গত তিন বছরে টেকনাফের গহিন পাহাড়কেন্দ্রিক অপরাধী চক্রগুলো ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে অপহরণ করেছে। এর মধ্যে কেবল গত এক বছরেই অপহৃত হয়েছেন অন্তত ১৯২ জন। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পারায় এবং মাদক চোরাচালানের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে গত তিন বছরে কমপক্ষে ২৫ থেকে ৩০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। অন্যদিকে, সাগরপথে মানব পাচারের শিকার হয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। গত এক-দেড় মাসেই নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের হাতে সাগর থেকে উদ্ধার হয়েছেন শতাধিক ভুক্তভোগী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কক্সবাজার-টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ, টেকনাফের বাহারছড়া, হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও জাহাজপুরা অঞ্চলের পাহাড় ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি সশস্ত্র বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ৬টি বাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক অপরাধীরা। বাকিগুলোতেও স্থানীয় অপরাধীদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের যোগসাজশ রয়েছে। এ অঞ্চলে সক্রিয় বাহিনীগুলোর মধ্যে রয়েছে নবী হোসেন বাহিনী। এ বাহিনীটি সবচেয়ে বড় ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত। এ ছাড়াও সক্রিয় রয়েছে জাবু ডাকাত বাহিনী, সালমান শাহ বাহিনী, শফি বাহিনী, হাকিম বাহিনী, হাসান বাহিনী, নূর আলম বাহিনী, খায়ের বাহিনী, পুতিয়া বাহিনী, জাকির বাহিনী, আলম ডাকাত বাহিনী এবং বদরুদ্দোজা ওরফে বদরুজ বাহিনী। রোহিঙ্গা ক্যাম্পকেন্দ্রিক আরসার ছায়ায় গড়ে ওঠা খালেক বাহিনী ও নুর কামাল বাহিনীও অপহরণ, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে সিদ্ধহস্ত। সম্প্রতি ক্যাম্পের গোলাগুলিতে নুর কামাল নিহত হলেও তার বাহিনীর তৎপরতা থামেনি। এ বাহিনীগুলোর অপরাধের ধরন অত্যন্ত নির্মম। দুর্ভেদ্য ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে তারা পাহাড়ের চূড়ায় ওয়াচ টাওয়ার ও বাংকার তৈরি করে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রশস্ত্র মজুত করেছে। তাদের মূল টার্গেট পর্যটক, ক্যাম্পে কর্মরত ব্যক্তি, স্থানীয় কৃষক, দিনমজুর, কাঠুরে, অটোরিকশাচালক ও সাধারণ রোহিঙ্গা। এক গ্রুপ অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পাহাড়ের গহিনে নিয়ে যায়। অতঃপর অপহৃত ব্যক্তিকে (অপহরণকারীদের ভাষা বলা হয় গরু) ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় অপর একটি গ্রুপের কাছে। দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে বিক্রির পর অপহৃতকে অকথ্য নির্যাতন করা হয়। সেই নির্যাতনের ভিডিও মোবাইল ফোনে পরিবারকে দেখিয়ে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করা হয়। যারা মুক্তিপণ দিতে পারে না, তাদের মেরে ফেলা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে জিম্মিদের ছাড়ার বদলে স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে কুতুবজোম, শাহপরীর দ্বীপ ও বাহারছড়া উপকূল দিয়ে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীদের হাতে বিক্রি করে দেওয়া হয়। মালয়েশিয়া পাঠানোর কথা বলে এদের ট্রলারে তুলে মাঝসাগরে জিম্মি করে রাখা হয় এবং সেখানেও চলে মুক্তিপণ আদায়ের খেলা। স্থানীয় বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা এবং শীর্ষ ইয়াবা কারবারিরাই এ বাহিনীগুলোর মূল গডফাদার। অপহরণ ও মানব পাচারে ঝুঁকি কম এবং এককালীন নগদ লাভ বেশি হওয়ায়, পুরোনো মাদক সিন্ডিকেটগুলোই এখন মানব পাচারে অর্থলগ্নি করছে ইয়াবা ডনেরা।
পাহাড়ে যৌথ অভিযান
কক্সবাজারের টেকনাফের লেদা ও রঙ্গিখালী পাহাড়ে মানব পাচারকারী, অপহরণকারী ও সশস্ত্র ডাকাতদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে যৌথ বাহিনী। গতকাল সকাল থেকে দুপুরে পর্যন্ত কয়েক শ’ সেনাসদস্য, বিজিবি, পুলিশ ও এসআরবির সদস্যরা এ অভিযান পরিচালনা করেন। এর আগে, শুক্রবার বিকাল থেকে দুর্গম পাহাড়ে তিনটি লাশ পড়ে থাকার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ খবরের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘ সময় তল্লাশি চালালেও কোনো লাশের সন্ধান পাননি।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, লেদা ও রঙ্গিখালীর দুর্গম পাহাড়ে তল্লাশি চালানো হয়েছে। সেখানে কোনো লাশ পাওয়া যায়নি। কেউ লাশ সরিয়ে ফেলেছে কি না, সে তথ্যও পুলিশের কাছে নেই। শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কয়েক শ’ সেনাসদস্য, বিজিবি, পুলিশ ও এসআরবির সদস্যরা লেদা ও রঙ্গিখালী পাহাড়ে অভিযান চালিয়েছেন। কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান বলেন, যত দিন মানব পাচার চলবে, তত দিন অভিযানও চলবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ নভেম্বর টেকনাফের রঙ্গিখালী এলাকার গভীর পাহাড়ে প্রায় ১২০ জন রোহিঙ্গা ও বাঙালিকে জিম্মি করে রাখার তথ্য পায় গোয়েন্দা সংস্থা। ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি সশস্ত্র মানব পাচারকারী দল তাদের জিম্মি করে রেখেছিল।
