হালাল পণ্য রফতানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার, স্বাধীন কর্তৃপক্ষ গঠনের তাগিদ
অনলাইন ডেস্ক
বৈশ্বিক হালাল পণ্যের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি সম্ভাবনা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রচুর সুযোগ রয়েছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশাধিকার, সনদায়ন, মান নিয়ন্ত্রণ ও সুনির্দিষ্ট ট্র্যাকিং নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ও সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ গঠন অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও অংশীজনরা।
শনিবার (৭ নভেম্বর) রাজধানীতে বিডিফেয়ার্স ও জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল (জেসিআই) ঢাকা অ্যাচিভার্স-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইনভেস্টরস মিট আপ ৩.০’ শীর্ষক সম্মেলনে বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেন। সম্মেলনটি বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই), লেদার ফাউন্ডেশন এবং জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (জেবিসিসিআই) সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে জানানো হয়, ‘ডিনার স্ট্যান্ডার্ডস গ্লোবাল ইসলামিক ইকোনমি রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ৭.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বার্ষিক ৬.২ শতাংশ হারে বেড়ে ২০৩৪ সাল নাগাদ প্রায় ১.৯ বিলিয়ন মুসলিম ভোক্তার এই হালাল বাজারের আকার দাঁড়াবে ১২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে। এর মধ্যে খাদ্য খাতের আকার সর্বোচ্চ ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার; যার পরেই রয়েছে ফ্যাশন পণ্য ১.৩১ ট্রিলিয়ন, পর্যটন ১.৩০ ট্রিলিয়ন, ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ ১.২৪ ট্রিলিয়ন এবং কসমেটিক্স বা প্রসাধনী ৪৬০ বিলিয়ন ডলার।
অথচ এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারের বিপরীতে সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ মাত্র ৯৪.৩ কোটি ডলারের হালাল পণ্য রফতানি করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮০২টি হালাল সনদপ্রাপ্ত পণ্য এবং ৩০১টি নিবন্ধিত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার হালাল অবকাঠামোর সফল অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মো. মমিনুল ইসলাম ‘হালাল ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব বাংলাদেশ’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ৯১ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী নিয়ে নিজস্ব বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি ওআইসি-ভুক্ত দেশগুলোতে রফতানির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া হালাল কৃষিপ্রযুক্তি, অর্গানিক চাল, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, মেরিন ফিশ থেকে বায়ো-প্রোডাক্ট হিসেবে হালাল জেলাটিন প্রস্তুত এবং সুকুক ও মুদারাবা ভিত্তিক ইসলামিক বন্ডের মাধ্যমে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, কৃষি, প্রবাসী আয় এবং তৈরি পোশাক—আমাদের অর্থনীতির প্রচলিত এই তিন প্রধান স্তম্ভে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। গার্মেন্টস খাতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারের কারণে এ খাতের কর্মসংস্থান তৈরির সক্ষমতা কমছে। এ অবস্থায় কোনো অতিরিক্ত ইউটিলিটি খরচ ছাড়াই শুধু বর্তমান উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক হালাল মান নিশ্চিত ও সহজে সনদ প্রদান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে পারি।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের প্রধান এ কে এম বদরুল আহসান জানান, ২০০৫ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সনদ দিয়ে আসলেও তাদের নিজস্ব কোনো স্বতন্ত্র ল্যাব নেই। বিএসটিআই-এর ল্যাব ও আন্তর্জাতিক প্রোটোকল মেনে তারা কারখানা পরিদর্শনের মাধ্যমে সনদ প্রদান করে থাকে। তিনি একক ছাতার নিচে সব প্রক্রিয়া নিয়ে আসতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ বা সমন্বিত হালাল ইনস্টিটিউট গঠনের প্রস্তাব দেন।
ট্রেসিবিলিটির গুরুত্ব তুলে ধরে আনোয়ার পারভেজ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু পণ্যের মান নয়, কাঁচামালের উৎস এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি সুতা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে, তুলার উৎপত্তি কী, সেটির সার্টিফিকেশন আছে কি না, এসব তথ্যও ক্রেতারা জানতে চান।
তিনি বলেন, কাঁচামালের উৎস থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। শুধু হালাল পণ্যের ক্ষেত্রেই নয়, তৈরি পোশাকশিল্পেও এ ধরনের ট্রেসিবিলিটি এখন বড় শর্ত।
আনোয়ার পারভেজ আরও বলেন, কৃষিতে ব্যবহৃত সার ও রাসায়নিক উপাদান পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, উৎপাদন প্রক্রিয়া পরিবেশবান্ধব কি না, এসব বিষয়ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও পণ্যের উৎস শনাক্ত করার বিষয়টি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এ ধরনের সার্টিফিকেশন ও ট্রেসিবিলিটি ছাড়া তৈরি পোশাক রফতানি কঠিন হয়ে উঠতে পারে। গার্মেন্টস খাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের এসব শর্ত পূরণ করা সম্ভব হলে হালাল শিল্পেও একই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ জন্য প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
