তিন দিনে বন্ধ ছিল ১,৩০০ কারখানা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্প। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস এই শিল্পে কয়েক দিনের অস্থিরতা বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলে সৃষ্ট অরাজক পরিস্থিতিতে মাত্র তিন দিনে বন্ধ রাখতে হয়েছে ১ হাজার ৩০০টির বেশি কারখানা। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েন সাড়ে ৭ লাখের বেশি শ্রমিক। ব্যাহত হয়েছে উৎপাদন, পিছিয়ে যাচ্ছে রপ্তানি চালান। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, দেশের শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়া এবং বিদ্যমান ক্রয়াদেশ ধরে রাখা নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, কয়েক দিনের অস্থিরতায় শুধু উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ক্রেতারা বিকল্প দেশ থেকে পোশাক সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে বাংলাদেশের ক্রয়াদেশ তৃতীয় কোনো দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পের সংকট আরও গভীর হওয়ার শঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেলের তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ৩ নভেম্বর-এই তিন দিনে মিরপুর, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে ১ হাজার ৩০০টির বেশি কারখানা বন্ধ ছিল। এর মধ্যে মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে বন্ধ ছিল ১৯২টি। আশুলিয়ায় বন্ধ ছিল ৪৬২টি কারখানা। গাজীপুরে ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে বন্ধ ছিল ৭২০টি। আর নারায়ণগঞ্জে ১৯৭টি কারখানার মধ্যে বন্ধ ছিল ২৯টি।

এই তিন দিনে বন্ধ থাকা কারখানাগুলোর মধ্যে মিরপুরে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ৪১ হাজারের বেশি। আশুলিয়ায় ২ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি, গাজীপুরে সাড়ে ৪ লাখের বেশি এবং নারায়ণগঞ্জে ২১ হাজারের বেশি শ্রমিক কর্মস্থলে যেতে পারেননি। সব মিলিয়ে সাড়ে সাত লাখের বেশি শ্রমিক কর্মহীন ছিলেন।

পিছিয়ে যাচ্ছে রপ্তানি চালান : কারখানা বন্ধ থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য উৎপাদন ও জাহাজীকরণ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে বড়দিন বা ক্রিসমাসকে সামনে রেখে বিদেশি ক্রেতাদের জন্য যেসব পোশাকের চালান নির্ধারিত সময়ে পাঠানোর কথা ছিল, সেগুলো পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, ক্রিসমাস উপলক্ষে ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। সময়মতো চালান পাঠাতে না পারলে ক্রেতারা পণ্য নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন অথবা মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন। এতে রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার কারণে শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিটি ক্রয়াদেশের বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সূচি থাকে। সেই সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হলে কারখানাকে মূল্যছাড় দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্য গ্রহণেও অনীহা দেখাতে পারেন। ফলে কয়েক দিনের অস্থিরতার প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে শিল্পকে বহন করতে হতে পারে।

ক্রেতাদের আস্থায় সংকট : শিল্পাঞ্চলের অস্থিরতা বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশে নিয়মিত আসা ক্রেতা প্রতিনিধিরা বিভিন্ন কারখানা পরিদর্শন, উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই এবং নতুন ক্রয়াদেশ নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সফর এবং এখান থেকে নতুন ক্রয়াদেশ দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বিদেশি ক্রেতারা নিয়মিত বাংলাদেশে এসে কারখানা পরিদর্শন করেন এবং ক্রয়াদেশ নিয়ে আলোচনা করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক অস্থিরতার কারণে তাঁদের বাংলাদেশ সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ক্রেতারা জানতে চাইছেন, দেশের শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না।

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতির পেছনে শুধু মজুরি-সংক্রান্ত বিষয় রয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ মজুরি বোর্ড গঠনের পরও এ ধরনের অস্থিরতা তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক। তাঁর আশঙ্কা, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে বিদেশি ক্রেতাদের অন্য দেশে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

সংকটে সহযোগী শিল্পও : তৈরি পোশাকশিল্পের প্রভাব শুধু মূল কারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবহন, বন্দর, ব্যাংকিং, প্যাকেজিং, সুতা, কাপড়, খাদ্য সরবরাহ ও আবাসনসহ অসংখ্য সহযোগী খাত এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। বড় কারখানার পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য ছোট ও মাঝারি সহযোগী প্রতিষ্ঠান। এসব কারখানাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শ্রমিকদের আবাসন, দোকানপাট, হোটেল ও রেস্তোরাঁ।

ফলে বড় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শিল্পাঞ্চলে। পণ্য পরিবহন, কাঁচামাল সরবরাহ এবং অন্যান্য সেবা কার্যক্রমও ব্যাহত হয়। কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রমিক-কর্মচারীরাও। অর্থাৎ তিন দিনের কারখানা বন্ধের ক্ষতি শুধু সরাসরি পোশাকশ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রভাব পড়ছে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে।

আরও সংকটের আশঙ্কা : ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে এমনিতেই দেশের তৈরি পোশাকশিল্প কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা আরও দুর্বল হতে পারে। ক্রেতারা সময়মতো পণ্য সরবরাহ, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশে এসব বিষয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তাঁরা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকতে পারেন। তাঁদের মতে, একবার কোনো ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে গেলে তা ফিরিয়ে আনা সহজ নয়। কারণ আন্তর্জাতিক পোশাকবাজারে প্রতিযোগী দেশগুলো সব সময় নতুন ক্রয়াদেশ পাওয়ার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা মনে করেন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে পোশাক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি, মালিকপক্ষের সক্ষমতা এবং শিল্পের সামগ্রিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত স্থিতিশীল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় কয়েক দিনের অস্থিরতার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights