কলকাতার নিউমার্কেটে বেড়েছে হোটেল ভাড়া, দিশেহারা চিকিৎসা নিতে আসা পর্যটকরা
দীপক দেবনাথ, কলকাতা
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর অনিয়মের অভিযোগে একের পর এক হোটেল ও গেস্ট হাউস বন্ধের নির্দেশ দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি পর্যটক ও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীদের নিয়ে স্বজনেরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
সাভারের ৮২ বছর বয়সী সালেয়া বেগম মাথায় টিউমারসংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কলকাতায় চিকিৎসা নিতে এসেছেন। নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে উঠেছিলেন তারা। তবে অনিয়মের অভিযোগে হোটেলটি বন্ধের নির্দেশ পাওয়ায় সোমবার লাগেজ নিয়ে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায় বৃদ্ধাকে। বয়সের ভারে হাঁটতে এবং কম শোনার কারণে তাঁকে নিয়ে নতুন হোটেল খোঁজাও কঠিন হয়ে পড়েছে ছেলে মনির হোসেনের জন্য।
মনির হোসেন জানান, ২০ আগস্ট মায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসেছেন। যে হোটেলে ছিলেন, সেটি সরকারি নির্দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে তিনি কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের আনাগোনা দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলোতে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়েছে। কলকাতা পৌরসভা, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং কলকাতা ইলেকট্রিক সাপ্লাই করপোরেশন (সিইএসসি) যৌথভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক হোটেল ও গেস্ট হাউস প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। অভিযানের পর অন্তত অর্ধশতাধিক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউসকে নতুন করে পর্যটক না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগে থেকে অবস্থানরত অতিথিদেরও হোটেল ছাড়তে বলা হচ্ছে।
এতে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসা বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। ঢাকার নাসিব পাপ্পু নিজের ও মায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় এসে হোটেল ছাড়ার নির্দেশ পান। তিনি বলেন, রাতে হোটেলে ফেরার পর কর্তৃপক্ষ জানায়, সোমবার সকাল ১০টার মধ্যে হোটেল ছাড়তে হবে। পরে সকালে হোটেল ছেড়ে নতুন থাকার জায়গা খুঁজতে বের হন তারা।
নাসিব বলেন, চিকিৎসার জন্য এসে হোটেল নিয়ে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। ভবিষ্যতে কলকাতার পরিবর্তে ভারতের অন্য রাজ্যে চিকিৎসা ও ভ্রমণের কথা ভাববেন বলেও জানান তিনি।
কুমিল্লার ক্যান্সার আক্রান্ত রেহানা আক্তারও নিউমার্কেটের একটি হোটেলে অবস্থান করছেন। মঙ্গলবার মুকুন্দপুরের একটি হাসপাতালে তাঁর দ্বিতীয় দফার কেমোথেরাপি দেওয়ার কথা। তবে হোটেল খালি করার নির্দেশ এলে কোথায় থাকবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
রেহানার মেয়ে বুশরা নূর বলেন, চিকিৎসা নিতে আসা বাংলাদেশি পর্যটকদের কথা বিবেচনা করে সরকারকে হোটেলগুলো খালি করার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া এবং বিকল্প ব্যবস্থা রাখা উচিত।
এদিকে নিউমার্কেটের হোটেলগুলোতে অভিযান ও বন্ধের নির্দেশের প্রভাব পড়েছে আশপাশের এলাকার আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ও। অভিযোগ উঠেছে, সুযোগ নিয়ে কিছু হোটেল স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া নিচ্ছে। আগে ৫০০-৬০০ রুপিতে যে কক্ষ পাওয়া যেত, এখন তা দেড় থেকে দুই হাজার রুপি পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গেস্ট হাউসের পাশাপাশি পর্যটকনির্ভর ট্যাক্সি ব্যবসাতেও এর প্রভাব পড়েছে। স্থানীয় ট্যাক্সিচালক সেলিম বলেন, পর্যটক কমে গেলে তাদের ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। হোটেলগুলো হঠাৎ বন্ধ না করে সরকারকে কিছুটা সময় দেওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে হোটেল বন্ধের সিদ্ধান্তে শুধু বাংলাদেশি পর্যটক নন, কলকাতায় কম খরচে চিকিৎসা নিতে আসা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলার মানুষও সমস্যায় পড়েছেন। হোটেল ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তাদের চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে।
অন্যদিকে, নিউমার্কেটের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেফতার হোটেল মালিক বীরেশ্বর মিত্রকে ১২ দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। রবিবার ব্যাংকশাল আদালতে হাজির করা হলে আগামী ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁকে পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
