ছক্কার জাদুকর ম্যাক্সওয়েলের স্মরণীয় ৬
অনলাইন ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আঙিনা থেকে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের বিদায় মানেই এক মহাতাণ্ডব ও ধ্বংসযজ্ঞের ইতি টানা। ‘দ্য বিগ শো’ খ্যাত এই অজি অলরাউন্ডার তাঁর ক্যারিয়ারজুড়ে প্রতিপক্ষের বোলিং লাইনআপ দুমড়ে-মুচড়ে যে বিধ্বংসী ইনিংস এবং অভাবনীয় সব শট উপহার দিয়েছেন, তা ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। তবে এত সব অবিশ্বাস্য সব চোখধাঁধানো মুহূর্ত এবং ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ইনিংস থাকা সত্ত্বেও ৩৮ বছর বয়সী এই তারকার বিদায়লগ্নে একটা আক্ষেপের ছায়াও রয়ে গেছে; অনেকেরই মনে হচ্ছে তাঁর যে অসীম প্রতিভা ছিল, সেটির পূর্ণ বিকাশ শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে গেল।
চলতি মাসে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজের অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা না পেয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার বিদায়ী ম্যাচ খেলার স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়, যার পরেই তিনি তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানেন। তবে তিনবারের এই বিশ্বকাপজয়ী স্মরণের পাতায় রেখে গেছেন এক দীর্ঘ স্মরণীয় তালিকা, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ওডিআই ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বলে বিবেচিত সেই মহাকাব্যিক ইনিংসটিও।
ম্যাক্সওয়েলের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে স্মরণীয় করে রাখা এমনই ছয়টি সেরা এবং ধ্বংসাত্মক ইনিংসের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
তালিকার প্রথম ও ক্যারিয়ার-সংজ্ঞায়িত পারফরম্যান্সটি ছিল ২০২৩ সালের ওডিআই বিশ্বকাপে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সেই অবিশ্বাস্য মিরাকল। জয়ের জন্য ২৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া যখন মাত্র ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে দ্রুত টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার চরম দ্বারপ্রান্তে, তখন উইকেটে অপরাজিত ২২ রান নিয়ে ব্যাট করছিলেন ম্যাক্সওয়েল। সেখান থেকে অধিনায়ক প্যাট কামিন্স তাকে সঙ্গ দিতে মাঠে নামেন এবং অজি অলরাউন্ডার শুরু করেন তাঁর অবিশ্বাস্য তান্ডব। ক্র্যাম্পের তীব্র যন্ত্রণায় শেষ ১০ ওভারে একপ্রকার হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা ম্যাক্সওয়েলকে বারবার তরল ও দীর্ঘ চিকিৎসাসেবা নিয়ে ক্রিজে টিকতে হয়েছিল। কিন্তু পা যেন কংক্রিটের মতো ক্রিজে জমে গিয়েছিল, সেই অবস্থাতেই পায়ের কোনো কাজ ছাড়াই তিনি ১২৮ বলে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কার সাহায্যে ২০১ রানের অপরাজিত এক ঐতিহাসিক ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকান। তাঁর এই মহাকাব্যিক রূপকথার মতো ইনিংসেই ভর করে অস্ট্রেলিয়া সেমিফাইনালে পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি উঁচিয়ে ধরে।
দ্বিতীয় সেরা ইনিংসটি আসে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে পাল্লেকেলেতে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে এক টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে। অফ-ফর্মে থাকা ম্যাক্সওয়েল ইনজুরিতে পড়া অ্যারন ফিঞ্চের অনুপস্থিতিতে প্রথমবারের মতো টি-টোয়েন্টিতে ওপেন করতে নেমেছিলেন। প্রথম ওভারেই রিভার্স সুইপে ছক্কা হাঁকিয়ে আক্রমণাত্মক রূপের বার্তা দেন তিনি। ২৭ বলে অর্ধশতক পূরণ করার পর আরও ২২ বল খরচ করে তুলে নেন ক্যারিয়ারের প্রথম টি-টোয়েন্টি শতক। ৬৫ বলের ইনিংসে ১৪টি চার ও ৯টি ছক্কায় ১৪৫ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। তাঁর এই ইনিংসের সৌজন্যে অস্ট্রেলিয়া ৩ উইকেটে ২৬৩ রান সংগ্রহ করে, যা তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহের বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছিল।
ম্যাক্সওয়েল অস্ট্রেলিয়ার সেই বিরল ছয়জন ব্যাটারের একজন যাঁরা ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই সেঞ্চুরি করেছেন, যদিও তিনি মাত্র সাতটি টেস্ট খেলেছেন এবং তার একটিও দেশের মাটিতে নয়। ২০১৭ সালে ভারতের রাঁচিতে অনুষ্ঠিত টেস্টে তাঁর একমাত্র সেঞ্চুরির ইনিংসে এক অন্যরকম দায়িত্বশীল ম্যাক্সওয়েলকে দেখা যায়। নিজের প্রথম বাউন্ডারি মারতে তিনি ৫৬টি বল অপেক্ষা করেছিলেন। ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে ১৮৫ বলে ১০৪ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে প্রমাণ করেছিলেন লাল বলের ক্রিকেটেও তাঁর মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা চমৎকার ছিল, যদিও তাঁর এই লাল বলের সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
তাঁর আন্তর্জাতিক শতকের খরা কাটে ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (এসসিজি) শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে। মাত্র ৫১ বলে শতক হাঁকিয়ে তৎকালীন সময়ে অস্ট্রেলিয়ানদের পক্ষে দ্রুততম ও বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েন তিনি। ১০টি চার ও ৪টি ছক্কায় ১০২ রান করে আউট হলেও অস্ট্রেলিয়াকে এক গুরুত্বপূর্ণ জয় এনে দেন। এটিই ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম শতক। এই আসরে ট্রফি জয়ের পর তিনি পরবর্তীতে ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২০২৩ ওডিআই বিশ্বকাপ জয়ী দলের অন্যতম মূল কারিগর ছিলেন।
২০২৩ বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা মহাকাব্যিক ইনিংসের আগে নয়াদিল্লিতে নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ম্যাক্সওয়েল প্রদর্শন করেছিলেন তাণ্ডবময় ক্রিকেট। ৪১তম ওভারের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাট করতে নেমে মাত্র ৪০ বলে সেঞ্চুরি হাঁকান, যা পুরুষদের ওডিআই বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম এবং যেকোনো ওডিআইতে অস্ট্রেলীয় হিসেবে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। ৪৮তম ওভার শেষে ৭৫ রানে অপরাজিত থাকার পর বাস ডি লিডের এক ওভারে ৪, ৪, ৬, ৬ হাঁকান এবং শেষ পর্যন্ত একটি নো-বল ফুলটস ডেলিভারিতে ফাইন লেগের ওপর দিয়ে হুক করে নিজের রেকর্ড গড়া সেঞ্চুরিটি সম্পন্ন করেন।
তালিকার সর্বশেষ ও ষষ্ঠ স্মরণীয় ইনিংসটি আসে ২০২৪ সালের শুরুর দিকে অ্যাডিলেড ওভালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে এক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে। ২০২৩ বিশ্বকাপের ফর্ম ধরে রেখে ২৫ বলে হাফসেঞ্চুরি করার পর ঠিক একই গতি বজায় রেখে ৫০ বলে শতক স্পর্শ করেন। ৫৫ বলে ৮টি ছক্কায় ১২০ রান করে অপরাজিত থাকেন। এটি ছিল আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর পঞ্চম সেঞ্চুরি, যার মাধ্যমে তিনি রোহিত শর্মার সাথে যৌথভাবে পুরুষদের টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। তবে অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে সেটিই ছিল ‘দ্য বিগ শো’ গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারের শেষ আন্তর্জাতিক শতক।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
