জনগণ হারবে সেটাই নিয়ম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত ক্ষুদ্র আমাদের এই দেশ। এখানে আমরা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করেছি স্বাধীনতা এবং মুক্তির জন্য। পরিণামে যা পেয়েছি সেটা পুঁজিবাদীদের ব্যবস্থাই। আমাদের জন্যও উন্নত মানে ওই ব্যবস্থার ভিতরে বন্দি অবস্থায় উন্নত হওয়া। আমাদের দেশে নির্বাচন হয়; কিন্তু তাতে জেতে কারা? হারই বা কাদের? প্রতিটি নির্বাচনেই কারা যে হারবে সেটা পূর্বনির্দিষ্ট থাকে। জানা থাকে যে যারাই জিতুক হারবে জনসাধারণ। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সেটাই নিয়ম। আমেরিকায় যা ঘটে বাংলাদেশেও সেটাই ঘটে থাক। জয়ী হয় টাকাওয়ালারা। তাদের নাম ভিন্ন, কিন্তু পরিচয় অভিন্ন। তারা বিত্তবান ও সুবিধাভোগী। আমাদের দেশটা গরিব হলেও দেশের শাসনকর্তারা গরিব নন; তাঁরা গরিব দেশের ধনী বুর্জোয়া। পরপর তিনটি নির্বাচনে নানা রকম কারসাজির আশ্রয় নিয়ে বুর্জোয়াদের যে দলটি ধারাবাহিকভাবে বিজয়ী হয়েছিল তারা ধাপে ধাপে নিজেদের সুবিধার বৃদ্ধিকরণ এবং বঞ্চিত মানুষের বঞ্চনাকে দুঃসহ করে তোলার কাজে হৃদয়হীনভাবে তৎপর ছিল।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শাসক শ্রেণির যে অংশের শাসনের পতন ঘটেছে; সে অভ্যুত্থানের সূত্রপাত ঘটিয়েছে ছাত্ররা। যাদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে যে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছিল, তার অবসান ঘটানোর। ফ্যাসিবাদী সরকার কোনো আন্দোলনই সহ্য করতে প্রস্তুত ছিল না। ছাত্রদের আন্দোলন যখন প্রবল হয়ে উঠল, তখন তাকে দমনে সরকার যে ধরনের নিষ্ঠুরতার আশ্রয় নেয়, তাতে আন্দোলন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। বঞ্চিত মানুষের বিক্ষোভ পুঞ্জীভূত ছিল, সেটি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়। সংস্কৃতিকর্মীরাও যোগ দেন। দ্রোহযাত্রায় অসংখ্য মানুষ অংশ নেয়।
ফলে আমাদের ইতিহাসে যেটা কখনো ঘটেনি, সেটাই ঘটে গেছে, প্রধানমন্ত্রী দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছেন। তাঁর সাঙ্গপাঙ্গ ও চ্যালাচামুণ্ডাদের অনেকেই প্রথমে গা-ঢাকা দিয়ে পরে সীমান্ত পার হয়ে বিভিন্ন দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। নিয়ম এটাই যে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতন ও হুমকিধমকির মুখে সমাজবিপ্লবীরা হয় আত্মগোপন করবেন, নয়তো কারাবন্দি হবেন। এবার দেখা গেল উল্টো ঘটনা। রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব নিজ হাতে তুলে নেওয়া প্রধানমন্ত্রীই পলায়ন করেছেন, জনতার ভয়ে। তবে তাতে বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থার যে পরিবর্তন অত্যাবশ্যকীয় ছিল, সেটা যে ঘটেছে তা নয়।
১৬-১৭ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের স্বৈরাচারী তৎপরতা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল তার একটা আভাস পাওয়া যায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে গুম ও খুন হওয়ার ঘটনাগুলো থেকে। যাঁরা খুন হয়েছেন, তাঁদের খবর তো পাওয়াই যায়নি, গুম হওয়ার পরে প্রাণ হাতে নিয়ে যাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদের মনেও পুনরায় অপহৃত হওয়ার ভীতি এমন প্রবল করে দেওয়া হয়েছিল যে তাঁদের কেউই মুখ খোলার সাহস পাননি। কেউ কেউ তো প্রকাশ্যে আসাকেও নিরাপদবোধ করেননি। অভিযোগ উঠেছে যে নির্যাতনের ঘটনাগুলো যারা ঘটাত তারা ছিল প্রধানমন্ত্রীর খাস নিয়ন্ত্রণে। সরকার-পরিবর্তনটা নির্বাচনের মাধ্যমে বিনা রক্তপাতেই ঘটতে পারত, কিন্তু শেখ হাসিনা সেটা হতে দেননি। প্রাণহানি ঘটেছে অকল্পনীয় মাত্রায়। শিশু ও নারীরাও বাদ পড়েনি। এমনও বলাবলি হচ্ছে যে ডোনাল্ড ট্রাম্প হত্যা করেছেন ভিন দেশের মানুষকে, আর শেখ হাসিনার লক্ষ্যবস্তু ছিল তাঁর নিজের দেশের মানুষ। ভোট দিয়ে যাঁরা তাঁকে শাসনক্ষমতায় বসিয়েছেন বলে বরাবর ছিল তাঁর দাবি। এর বাইরে, নিষ্ঠুরতার বেলাতে, ট্রাম্পে-হাসিনাতে পার্থক্য করা সহজসাধ্য নয়।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। প্রত্যক্ষে সুসংগঠিত কোনো নেতৃত্ব ছিল না। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন ছাত্রনেতাকে যে ‘মাস্টার মাইন্ড’ বলে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন-সেটি হয়তো ভ্রমবশতই ঘটেছে। কেননা অভ্যুত্থানের পেছনে অমন কোনো ‘মাইন্ড’ যে কাজ করেনি সেটা জ্ঞাত সত্য। মাস্টার মাইন্ড তো স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে প্রয়োজন হয় না, দরকার পড়ে ষড়যন্ত্রে। জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থান কোনো ষড়যন্ত্রের ফসল কি? প্রত্যক্ষে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের পরিণতি। তবে যাঁরা নেতৃত্বে ছিলেন, তাঁদের তিনজন অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হওয়া এবং অন্যদের হাতেও অপ্রত্যাশিত পরিমাণ ক্ষমতা চলে আসায়, নেতৃত্বদানকারীদের ভিতর রাজনৈতিক দল গঠন করে প্রাপ্ত ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার ইচ্ছাটা যে জেগে উঠবে-এটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত নেতাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টাও হয়তো বিবেচনায় চলে এসেছিল; নিরাপত্তার জন্য রাজনৈতিক দল গঠনটাই কৌশলগত উত্তম পন্থা বৈকি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করার সময় নেতাদের মধ্যে উচ্চমাত্রায় আত্মবিশ্বাস দেখা দিয়েছিল। নইলে একনিঃশ্বাসে এমন ঘোষণা তাঁরা জারি করেন কী করে যে তাঁদের পার্টি তিন শ আসনেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পরে বাস্তব অবস্থা তাঁদের সংযত করেছে এবং শিখিয়েছে যে আলাদাভাবে না দাঁড়িয়ে বড় দুই দলের একটির সঙ্গে আসন সমঝোতায় আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তখন তাঁরা সে উদ্যোগই নিয়েছেন। বড় দল তো দুটি-বিএনপি এবং তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী। ছাত্রনেতারা উভয় দলের সঙ্গেই দরকষাকষি করেছেন। বিএনপি প্রকাশ্যে আন্দোলন করা, জুলুম নির্যাতন, কারাভোগ, গুম, খুন সহ্য করা পুরোনো দল। নির্বাচন হলে তারাই সরকার গঠন করবে, এমন আত্মবিশ্বাস বিএনপির ছিল।
তদুপরি ইতোমধ্যেই তাদের সঙ্গে একসময়ের বামপন্থি কয়েকটি দল জোটবদ্ধ হয়, যাদের অল্প হলেও কিছু আসন ছেড়ে দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে নবগঠিত একটি দলের জন্য প্রশস্ত অবস্থানের ব্যবস্থা করা তাদের পক্ষে মোটেই সম্ভব ছিল না। ছাত্রনেতাদের সদ্য গঠিত দল তখন জামায়াতের দ্বারস্থ হয়। জামায়াতের দিক থেকে তরুণদের সঙ্গে পাওয়াটা প্রয়োজন ছিল; কেবল যে দল ভারী করার জন্য তা নয়, অতীতের কলঙ্ক আড়াল করার কাজে সহায়তার জন্যও। বলার আবশ্যকতা নেই যে জামায়াত খুব বড় আকারে ছাড় দেবে এমন আশা ছিল নিতান্তই অবাস্তব। তবে শেষ পর্যন্ত ত্রিশ আসনে সমঝোতা হয়। অভ্যুত্থানে সফল হয়ে ছাত্রনেতারা নতুন ধরনের রাজনীতি উপহার দেবেন-এমন আশা জাগানোর পরে তাঁদের দল অতিশয় পুরোনো একটি দলের সাহায্যপ্রার্থী হবে-এমনটা দেশের মানুষ তো বটেই, সংগঠনের ভিতরের অনেকেও তখন আশা করেননি। নতুন দলের একাংশ, বিশেষ করে মেয়েরা প্রতিবাদ করেন। তাঁদের অনেকের বিচ্ছিন্ন এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কিন্তু প্রধান অংশ তাদের শাপলা কলি প্রতীকের জন্য জামায়াতের দাঁড়িপাল্লাতে জায়গা খুঁজে নেওয়াটকেই বাঞ্ছনীয় ভাবে। এরকমের পরিণতি যে অপ্রত্যাশিত ছিল তা অবশ্য বলা যাবে না। কারণ এনসিপি সমাজবিপ্লবী দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, দলটির তারুণ্যের ভিতর রক্ষণশীল উপাদানের উপস্থিতির প্রমাণ বিভিন্ন ফাঁকফোকর দিয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল।
এসব প্রেক্ষাপট পেরিয়ে ত্রয়োদয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুর্ষ্ঠিত হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায়। বিরোধী বেঞ্চে জামায়াত-এনসিপিসহ তাদের শরিক। সংসদ যথেষ্ট প্রাণবন্তই বলা যায়। দুই পক্ষের তীব্র-তীক্ষ চাপান উতোরে কখনো উত্তপ্ত সংসদ। কখনো বা হাস্যরসে সৌহার্দ্যরে সুবাতাস। অতিসম্প্রতি জ্বালানিসংকট মোকাবিলার পথ খুঁজতে সরকার ও বিরোধী দলের সমসংখ্যক সদস্যের সমন্বয়ে একটা বিশেষ কমিটি গঠন করা হলো। তারা যৌথভাবে সমাধানের পথ খুঁজবে। সুপারিশ করবে। এ চর্চা আশা জাগায়। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত দেয়। জাতি যা থেকে বঞ্চিত হয়েছে দীর্ঘদিন।
♦ লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
