জব্দ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দিন
মন্জুরুল ইসলাম
আওয়ামী লীগের প্রায় ১৬ বছর দেশে চলে লাগামহীন লুটপাটের অর্থনীতি। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস ছিল মহালুটপাটের অর্থনীতি। আর নতুন সরকার পড়েছে যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার অর্থনীতিতে। একদিকে নতুন সরকারের নানানরকম চ্যালেঞ্জ; এর ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, জ্বালানিসংকট, প্রবাসীদের নিরাপত্তা, রেমিট্যান্সপ্রবাহ নিশ্চিত করা, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নসহ শত সংকটের মুখোমুখি দেড় মাসের শিশু সরকার। দেশের ভিতরে আরও কিছু সংকট আছে যেগুলো বিগত ১৮ মাসের সরকার সৃষ্টি করে গেছে। যেমন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মামলা, কথায় কথায় ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে ট্যাগ লাগানো, মব সন্ত্রাস সৃষ্টি করা, অনেকের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করা, যুবসমাজকে অসহিষ্ণু করে তোলা, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করার মতো অনেক সমস্যা। এসব সমস্যা হয়তো আস্তে আস্তে দূর করা সম্ভব হবে। তার জন্য হয়তো যুক্তিসংগত সময় দরকার হবে। তবে জব্দ ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো খুলে দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত খুব দ্রুতই নিতে হবে। যাঁদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তাঁদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। আর সন্দেহবশত যাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হলে অর্থনীতিতে অনেকটা ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সারা দেশে কত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ আছে, এর সঠিক তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে নেই। কারণ বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ছাড়াও আদালত, এনবিআর ও দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেও ব্যাংক হিসাব জব্দ, তলব করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাতে ১৭ হাজার ৩৪৫টি সন্দেহজনক লেনদেন ও কার্যক্রমসংক্রান্ত প্রতিবেদন (এসটিআর/এসএআর) বিএফআইইউতে দাখিল হয়েছে; যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২২ দশমিক ৯৬ শতাংশ বেশি। বিগত ইউনূস সরকারের সময়ে কয়েকভাবে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। প্রথমত হাতেগোনা কয়েকজন চিহ্নিত লুটেরার হিসাব জব্দ করা হয়েছে; যারা ব্যাংক, সরকারি টাকা ও সম্পদ লুট করেছেন। দ্বিতীয়ত যারা লুটেরা ব্যবসায়ী, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। তৃতীয়ত কিছু আমলা ও পেশাজীবীর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এ তিন স্তরের বাইরেও একটি বিরাট অংশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। সে সময় মব সৃষ্টিকারীরা কিছু বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেছিল। যাঁরা তাদের চাহিদামতো টাকা দিতে পারেননি বা দিতে অস্বীকার করেছেন, তাঁদের অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারের বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। এর মধ্যে হঠাৎ সংস্কারবাদী বনে যাওয়া কিছু ব্যবসায়ীও জড়িত ছিলেন। তাঁরা তাঁদের ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বীর অ্যাকাউন্ট জব্দ করার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন। অনেক পেশাজীবী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়েছে, ওই পেশারই কারও না কারও ব্যক্তিগত প্রভাব ও প্রতিহিংসার কারণে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ বা বিভিন্ন পেশাজীবীর ব্যাংক হিসাব বা সম্পদ জব্দ করা নিয়েও বড় ধরনের লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।
লুটপাটের অর্থনীতির যারা কুশীলব, তারা কেউ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকা লেনদেন করেননি। যারা লুটপাটের সাহস রাখেন, টাকা সরানোর কৌশলও তাদের জানা। যারা ব্যাংক লুট করেছেন তাদের কারও টাকা দেশে নেই। যে মন্ত্রী লন্ডনে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর মতো অত বোকা নন। যারা কানাডার বেগমপাড়ায় বাড়ি করেছেন তারা ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার মতো আহাম্মক নন। আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট রাঘববোয়ালদের যেসব অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে, সেগুলো মূলত তাদের পরিত্যক্ত। তা ছাড়া এমন সময় এগুলো জব্দ করা হয়েছে, যার অনেক আগেই তারা টাকা তুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারকারীর পরিত্যক্ত অ্যাকাউন্টে ৪-৫ কোটি যদি থাকে, আর সেই অ্যাকাউন্ট যদি জব্দ করা হয়, তাতে বড় কোনো সাফল্য নেই। ‘চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে’ প্রবচন এ ক্ষেত্রে খাটে। কিংবা এসব করা হয়েছে সজ্ঞানে সমঝোতার ভিত্তিতে। কিন্তু বিভিন্ন অজুহাতে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী বা শিল্পপতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে অনেক সাধারণ নাগরিকের অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়েছে। যাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই মবের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় আইনের আশ্রয় নেওয়ার সাহস পাননি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ন্যায়বিচার না পাওয়ার আশঙ্কা থেকেও অনেকে আইনের আশ্রয় নেননি। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারের সময় এসব বিষয়ে যৌক্তিক সুরাহা হওয়া উচিত। এর জন্য একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। জব্দ করা অ্যাকাউন্টধারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া উচিত। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে রুগ্ণ বা ঋণখেলাপি হয়েছে অ্যাকাউন্ট জব্দ হওয়ার কারণে। কেউ যদি অর্থ পাচার বা অবৈধভাবে টাকা উপার্জন করে থাকে, তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। দেশের আইনি মারপ্যাঁচে অনেক সময় বৈধ টাকাও অবৈধ হয়ে যায়। যেমন কেউ যদি ১ কোটি টাকায় জমি বিক্রি করেন, তিনি যখন ক্রেতাকে দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন, তখন ক্রেতার অনুরোধে মৌজার সরকারি দাম দলিলে উল্লেখ করেন। মৌজার সরকারি দাম যদি ১০ লাখ টাকা হয় তাহলে বিক্রেতার অর্জিত ৯০ লাখ টাকাই কালোটাকা হয়ে যায়। ওই টাকা যদি ব্যাংকে রাখা হয় তাহলে সরকার ইচ্ছা করলে ওই ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট জব্দ করতে পারে। কারণ ৯০ লাখ টাকার উৎস সম্পর্কে আইনগত উপযুক্ত কোনো প্রমাণ তার নেই। এ ধরনের অনেক আইনি মারপ্যাঁচে অনেক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার ঘটনাও আছে। তাই বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময় যতটা সম্ভব সহনশীল মনোভাব প্রদর্শন করে ধীরে ধীরে জব্দকৃত অ্যাকাউন্টগুলো অবমুক্ত ও সচল করা প্রয়োজন। কারণ জব্দকৃত টাকার কোনো মূল্য নেই। নাড়াচাড়া করলেই টাকা মূল্যবান হয়। তবে এটা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, একশ্রেণির লোভী রাজনীতিবিদ, অসৎ আমলা ও ব্যবসায়ী দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছেন। পাচার অর্থে যারা বিদেশে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন, তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করাই তাদের উপযুক্ত শাস্তি হতে পারে না। আর যাঁরা দেশেই অবস্থান করছেন, বিদেশে টাকা পাচার করেননি, দেশের মধ্যে যাঁরা প্রতিষ্ঠিত শিল্পোদ্যোক্তা, তাঁদের আর্থিক লেনদেন যাচাই করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়া উচিত। অপরাধীকে অপরাধের শাস্তি দেওয়ার মতো আইনগত কঠোরতা যেমন থাকতে হবে, তেমন নিরপরাধ মানুষকেও ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে হবে। তা না হলে সমাজের একটি অংশের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। আইনের শাসন বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি সঞ্চারিত হবে না। পৃথিবীর অর্থনীতি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় নতুন সরকারের কাছে দেশবাসী ঝুঁকিমুক্ত, সহনশীল অর্থনীতি ও স্বচ্ছন্দ জীবনযাপনের পরিবেশ প্রত্যাশা করে।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসেও অনেক লুটপাট হয়েছে, যা রীতিমতো মহালুটপাট। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব হওয়া চাই এসব মহালুটপাটের খোঁজখবরও নেওয়া। অবশ্য বিগত সময়ের তুলনায় ১৮ মাসের লুটেরারা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর ও ধূর্ততার সঙ্গে লুট করেছেন। সরকারে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা প্রায় সবাই ছিলেন বাছাই করা খেলোয়াড়। সরকারপ্রধান হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যেভাবে বৈধতার মুখোশ পরে অবৈধভাবে ব্যক্তিগত সুবিধা নিয়েছেন তা সুস্থ ও স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করলে বিস্মিত হতে হয়। তাঁর গ্রামীণ ব্যাংকের সহকর্মী স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম কী করেছেন তা এখন বুঝতে পারছেন বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ইতোমধ্যে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মোয়াজ্জেম হোসেনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। সিআইডি পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজ ৩০ মার্চ এ আদেশ দেন। সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আবদুল হান্নান তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আবেদনে বলেন, অভিযুক্ত মোয়াজ্জেম হোসেন অন্তর্বর্তী সরকারের স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া উপদেষ্টার এপিএস থাকাকালে তদবির বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার মালিকানা অর্জন করেন। এসব অর্থ তিনি অবৈধ উপায়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। এ অবৈধ সম্পত্তি অর্জনের বিষয়ে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি যেকোনো সময় বিদেশে পালাতে পারেন। অনুসন্ধানের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অনুসন্ধান কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার বিদেশ যাওয়া বন্ধ করা বিশেষ প্রয়োজন। প্রশ্ন হচ্ছে, এপিএস যদি শত শত কোটি টাকার মালিক হতে পারেন, উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কত টাকার মালিক হয়েছেন সেটা এখন সচেতন মহলের প্রশ্ন এবং অবশ্যই যথাযথ তদন্তের বিষয়।
মুখের আড়ালে যেসব মুখোশধারী সুশীল টাউট-বাটপাড়, নারীলোভী, বহুগামী বিগত ১৮ মাস সুশাসনের নামে দেশে নৈরাজ্য তৈরি করেছেন, লুটপাট করেছেন তাদের অচিরেই আইনের আওতায় আনতে হবে। আর এ অস্থির সময়েও অন্তর্বর্তী সরকারের ভিতরে থেকে যাঁরা ভালো কাজ করেছেন, তাঁদের দেশবাসী অবশ্যই সম্মান করে। মুখোশধারী ডিপ স্টেটের সহযোগীদের বিচার হতে হবে। বিশেষ করে সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান ক্ষমতায় থেকে যেসব অপকর্ম করেছেন তার তদন্ত করতে হবে। তাঁরা ডিপ স্টেটের কুশীলব কি না তা-ও দেখতে হবে। তা না হলে ছদ্মবেশী দেশদ্রোহীরা একসময় সুযোগ বুঝে আবার অক্টোপাসের মতো দেশের গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতা গিলে খেতে সচেষ্ট হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
manju209@yahoo.com
