জালিয়াতি ও মিথ্যে মামলার মানসিক চাপে দম্পতির একই সাথে স্ট্রোক করে মর্মান্তিক মৃত্যু
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ
দিনাজপুর সদর উপজেলার বড়হইল এলাকার বাসিন্দা মোঃ আমিনুল ইসলাম যিনি এলাকায় স্বপ্নে শিক্ষা আল্লাহর দান (লাইসেন্স নং ১২৩) নামে কবিরাজি ও তান্ত্রিক ব্যবসা চালিয়ে আসছেন তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার প্রতারণা, জমি দখল, চেক জালিয়াতি, ভুয়া মামলা, জাল কাগজপত্র তৈরি ও নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে দিনাজপুর-০৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন ভুক্তভোগী মোঃ আবু সাঈদ তালুকদার।
এদিকে কবিরাজ আমিনুল ইসলামের অব্যাহত হুমকি, জমি দখল এবং একের পর এক জালিয়াতির মিথ্যে মামলার চরম মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ (শনিবার) বিকেল ৫টায় ভুক্তভোগী হেলাল উদ্দিন (৫০) ও তার স্ত্রী লতিফা বেগম (৫০) একই সাথে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। টেনশনে মাত্র ৫ সেকেন্ডের ব্যবধানে উভয়েই স্ট্রোক করে মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, অভিযোগকারী মোঃ আবু সাঈদ তালুকদারের বাবা অসুস্থ হলে অভিযুক্ত কবিরাজ আমিনুল ইসলাম তাদের বাড়িতে এসে কালা জাদু করা হয়েছে বলে ভয় দেখায়। বাড়ি বন্ধ করার নামে ১০,০০০ টাকা এবং বাজার ছাড়া অন্য কোথাও না পাওয়া বিফালিয়ান পাউডার কেনার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে পরিবারের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে বোচাগঞ্জ থানার জমি পণমূল্য বিহীন অপ্রত্যাহারযোগ্য আম-মোক্তারনামা দলিল করে নেয়। এর পর পিতা ও বোন মোছাঃ মাহমুদা খাতুনকে বশীকরণ করে কাহারোল থানার জমি নামমাত্র মূল্যে কবলা রেজিস্ট্রি করে। এমনকি বোনকে বিয়ের প্রলোভন ও বশীকরণ করে তাদের বসতবাড়ির ৯.২৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে নেয়।
একইভাবে কসবা মৌজার বসতবাড়ির সামনের জমি দখলে ব্যর্থ হয়ে যৌথ অ্যাকাউন্টের ২টি ফাঁকা চেকে (ত্রিশ লক্ষ) টাকা করে বসিয়ে মাহমুদা খাতুন, আবু সাঈদ ও আবু বক্কর সিদ্দিকের নামে আদালতের মাধ্যমে দুটি মামলা (ঈজ-৪৯৩/২৬ ও ঈজ-৫৬৯/২৬) দায়ের করে। এ ছাড়া আরও ৮টি চেক ডিসঅনারের হুমকি দেয়। অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম উক্ত মাহমুদা খাতুনকে বশীকরণ ও সই জাল করে ইসলামী ব্যাংক পি.এল.সি পুলহাট শাখা থেকে টাকা উত্তোলন করে এবং ণগঈ চেক বইয়ের মাধ্যমেও টাকা তোলে। একইভাবে শেখপুরা এলাকার হেলাল উদ্দিনের ৩.৫ শতক জমি বশীকরণ করে বিনা পয়সায় দলিল করে নেয়। জমি দখল দিতে না পারায় হেলাল উদ্দিন ও তার স্ত্রীর নামে দিনাজপুর আদালতে চেক ডিসঅনারের মামলা এবং জামাতা মোঃ খোকনের নামে মিথ্যা চাঁদাবাজির মামলা দেয়। হেলাল উদ্দিনের মেয়ে মোছাঃ রাবেয়া খাতুনের নামে ঠাকুরগাঁও আদালতে চেক ডিসঅনারের (সি.আর-২৮৯/২৫-পীরগঞ্জ) মামলা দায়ের করানো হয়। উক্ত মামলাটি কবিরাজের রক্ষিতা মোছাঃ মল্লিকাকে দিয়ে দায়ের করা হয়। মল্লিকাকে বিয়ে না করে দীর্ঘদিন ধরে রক্ষিতা হিসেবে রেখে নির্যাতন ও ধর্ষণ করে আসছে বলেও অভিযোগে প্রকাশ।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, কবিরাজ আমিনুল ইসলাম চিকিৎসার নামে কৌশলে মতিভ্রম ওষুধ প্রয়োগ ও বশীকরণ করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিয়ে রাখত। পরবর্তীতে ওষুধ, তাবিজ ও সমস্যার সমাধানের দোহাই দিয়ে লাখ লাখ টাকা দাবি করত। দাবি না মানলে নারীদের অশ্লীল ছবি ও ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে তা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করত। সে নিজের বাড়িতে এবং দিনাজপুর শহরের রেস্টুরেন্ট ও হোটেলে নিয়ে মতিভ্রম ওষুধ খাইয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বশীকরণ করে ব্যাংকের ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর নিত।
অভিযুক্ত আমিনুল ইসলাম নিজেকে কখনো হাজী, কখনো হাফেজ, কখনো ডাক্তার, আবার কখনো আইনজীবী বলে পরিচয় দেয়। তার এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল। তার জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ভুয়া, পাসপোর্টও ভুয়া এবং জন্মতারিখ সংক্রান্ত ২টি ভিন্ন ভিন্ন ভুয়া পাসপোর্ট রয়েছে। এ ছাড়া স্বামী-স্ত্রী মিল মহব্বত বা প্রলোভন দেখিয়ে ভূয়া এফিডেভিট করে নারীদের গোপন বিয়ে ও সন্তান অস্বীকার করার বহু অভিযোগ রয়েছে, যা লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে গোপন রাখেন।
পূর্বে ধর্ষণের অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালতে তার জেল হয়েছিল, যা বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এক পাগলকে খুন করিয়ে নমিজদের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টাও করেছিল সে, যা জেলা দায়রা জজ আদালতে বিচারধীন। এ ছাড়া কাহারোল থানার শ্রী মানিক ও তার ভাই শংকরকে বশীকরণ ওষুধ খাইয়ে জমির বায়না দলিল এবং ২টি ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর করিয়ে চেক ডিসঅনার মামলার হুমকি দিলে মানিক আদালতে মামলা দায়ের করেন। এসব ভণ্ডামি, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে কবিরাজ আমিনুল বর্তমানে প্রায় ৩০-৩২ কোটি টাকার মালিক বনে গেছে এবং বিভিন্ন এলাকায় বে-নামীতে ৩ কোটি টাকার জমি ক্রয় করেছে। এই অবৈধ ও অনৈতিক সিন্ডিকেটে তাকে সরাসরি সহযোগিতা করে তার ভাই আবু বক্কর সিদ্দিক, মোঃ আনোয়ার হোসেন, ভগ্নিপতি মকলেছুর রহমান এবং মিনতী রানী ।
ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী এই ধূর্ত, লম্পট, ধর্ষক, ভুমিদস্যু ও প্রতারক কবিরাজ এবং তার সহযোগী সিন্ডিকেটের হাত থেকে সাধারণ জনগণকে রক্ষায় এবং দম্পতির অকালমৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রত গ্রেপ্তার করে কঠোর শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন।
