জুলাই সনদ ঐক্যবদ্ধ করবে, বিভক্ত নয়

বিশেষ প্রতিনিধি

জুলাই সনদকে কখনোই আরেকটি রাজনৈতিক ইশতেহার হিসেবে তুলে ধরা হয়নি। এটি জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোড়ন সৃষ্টিকারী অধ্যায়ের পর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের একটি রূপরেখা হিসেবে এটি প্রণীত হয়েছে। নীতিগতভাবে এটি দীর্ঘদিনের সাংবিধানিক ও শাসনব্যবস্থাগত সংস্কারের দাবিগুলোকে বাস্তব রূপ দেওয়ার একটি আন্তরিক প্রচেষ্টা।

সনদের অনেক প্রস্তাবই সমর্থনযোগ্য। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমা নির্ধারণ, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলা—এসব সংস্কারের দাবি বহু বছর ধরেই জনপরিসরে উচ্চারিত হয়ে আসছে। তবু একটি ভালো সনদও দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার কারণে বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত সংলাপ আয়োজনের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশন অবশ্যই কৃতিত্বের দাবিদার। কিন্তু সংলাপ আর ঐকমত্য এক বিষয় নয়। কমিশন ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা করেছে; নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়।

আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, সনদটিতেই একাধিক মৌলিক বিষয়ে উল্লেখযোগ্য মতভিন্নতার কথা লেখা রয়েছে। অর্থাৎ সনদটির নিজস্ব ভাষ্য অনুযায়ী, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমঝোতার প্রতিফলন; কিন্তু সর্বসম্মত জাতীয় চুক্তি নয়। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবু জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিয়ম করে সনদটি এমনভাবে উপস্থাপন করছে, যাতে মনে হচ্ছে, যেন এটি প্রশ্নাতীত একটি ন্যাশনাল ম্যান্ডেট। যে আখ্যানটি সামনে আনা হচ্ছে, তার সারকথা হলো—একটি গণভোট বা সনদের প্রতি জনসমর্থনই বিতর্কিত সাংবিধানিক প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করবে এবং ভবিষ্যৎ সরকারগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবায়ন কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করবে। এ ধরনের ব্যাখ্যা বিপজ্জনকভাবে অতিসরলীকৃত।

গণভোট কোনো সংস্কারকে রাজনৈতিক বৈধতা দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া, সংসদীয় পর্যালোচনা কিংবা গণতান্ত্রিক সংলাপের বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে এটি সনদের মধ্যেই স্বীকৃত মতপার্থক্যগুলোকে বাদ দিতেও পারে না।

আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি বা এর বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলা ব্যক্তিদের ধারাবাহিকভাবে জুলাই অভ্যুত্থান কিংবা সংস্কারের চেতনার বিরোধী হিসেবে দেখানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের অবস্থান গণতান্ত্রিক পরিসরকে সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে থাকা মানেই প্রতিটি প্রস্তাব বা তার প্রতিটি বাস্তবায়ন পদ্ধতির প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন নয়। একটি সুস্থ গণতন্ত্র রাজনৈতিক একরৈখিকতার ওপর নয়, বরং যুক্তিসংগত মতভিন্নতা, উন্মুক্ত বিতর্ক এবং ভিন্নমতকে ধারণ করার সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

জুলাই সনদের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকবে এর অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রে। এটি যদি জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হতে চায়, তাহলে ভিন্নমতকে অস্বীকার নয়, বরং স্বীকৃতি দিতে হবে। যে দলিল বিভাজনের বদলে ঐকমত্যের সংস্কৃতি গড়ে তোলে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাকেই টিকিয়ে রাখে। এই বিরোধ ক্রমান্বয়ে এখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ঐকমত্য গঠনের জন্য তৈরি হওয়া একটি দলিল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

এখানেই জামায়াত ও এনসিপি সমালোচনার মুখে পড়ছে। জুলাই সনদকে আরো বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠনের কাজে ব্যবহার করার বদলে তারা ক্রমেই এটিকে দলীয় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় আগ্রহী হচ্ছে, যেখানে প্রতিটি সাংবিধানিক বিতর্ককে জুলাই আন্দোলনের প্রতি অঙ্গীকারের কষ্টিপাথরে পরীক্ষা করা হচ্ছে। এ ধরনের রাজনীতি সাময়িক সুবিধা দিতে পারে, কিন্তু টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এগিয়ে নিতে তেমন কোনো ভূমিকা রাখবে না।

দায়বদ্ধতা শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর বর্তায় না; সরকারকেও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যেন তারা এই সনদকে প্রশ্নাতীত জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপনের ফাঁদে না পড়ে। এটি কোনো প্রশ্নাতীত জাতীয় ঐকমত্যের প্রতিফলন নয়। এতে বিস্তৃত পরামর্শ, যথেষ্ট ঐকমত্য এবং একই সঙ্গে উল্লেখযোগ্য মতভেদও দেখা গেছে। এসব মতপার্থক্য স্বীকার করা দুর্বলতা নয়, বরং এটিই গণতান্ত্রিক রাজনীতির মূল সত্তা।

জুলাই ২০২৪-এ যাঁরা মিছিল করেছিলেন, তাঁরা দায়বদ্ধ প্রতিষ্ঠান, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন এবং আরো ভারসাম্যপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থার দাবি তুলেছিলেন। তাঁরা আরেক দফা রাজনৈতিক অচলাবস্থা বা ক্ষমতার জন্য কৌশলগত লড়াই চাননি।

জুলাই সনদ এখনো বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। তবে তা তখনই সম্ভব, যখন রাজনৈতিক দলগুলো এটিকে বৃহত্তর জাতীয় সংলাপের সূচনা হিসেবে দেখবে; দলীয় বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে নয়। তা না হলে দেশকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য তৈরি করা একটি দলিল উল্টো সেই বিভাজনই আরো গভীর করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights