তারুণ্যের শক্তি, ক্রীড়ার বিকাশ আগামীর বাংলাদেশ
একটি দেশের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে কিংবা অবকাঠামোগত সমৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল প্রজন্ম গড়ে তোলাও উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। আর এই প্রজন্ম গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা অপরিসীম। খেলাধুলা তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তার পাশাপাশি নেতৃত্বের গুণাবলি তৈরি করে, দলগত কাজের স্পৃহা বাড়ায় এবং জয়পরাজয়কে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার শিক্ষা দেয়। এ উপলব্ধি থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় আগামীর বাংলাদেশপর্যায়ে ক্রীড়াচর্চাকে আরও গতিশীল ও বিস্তৃত করার প্রত্যয়ে যাত্রা করছে এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের। বহুলপ্রতীক্ষিত এই আসরের পর্দা উঠছে আজ। তারুণ্যের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে উৎসবে মেতে উঠবে এবিজি স্পোর্টস সিটি।
দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পৃষ্ঠপোষকতা এবং ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো ও মান উন্নয়ন করা সম্ভব। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এবিজি তথা বসুন্ধরা গ্রুপের অবদান নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন খেলায় পৃষ্ঠপোষকতা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপ দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বসুন্ধরা গ্রুপের সম্মানিত চেয়ারম্যান স্বপ্নচারী আহমেদ আকবর সোবহান দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। দিগন্ত পেরিয়ে আকাশছোঁয়া তাঁর এই স্বপ্নের পরিধি। তাঁর স্বপ্নের মূল উপজীব্য বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনে দাপিয়ে বেড়াবেন এ দেশের ক্রীড়াবিদরা। তাঁর এ স্বপ্নের মায়াজালে আচ্ছন্ন করতে চান দেশের নবীন ও তরুণদের। সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরেই দেশীয় ক্রীড়াঙ্গনে কান্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ তিনি। তাঁর এ স্বপ্নপূরণের পথচলায় সহযোদ্ধা তাঁরই সুযোগ্য পুত্র আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের সম্মানিত চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীর। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে দেওয়ার অভিপ্রায়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন তিনি। ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম ক্রীড়া অবকাঠামো এবিজি স্পোর্টস সিটি তাঁদের সেই স্বপ্ন ও অঙ্গীকারের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তাই এটি শুধু একটি নিছক ক্রীড়া স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আন্তর্জাতিক মানে এগিয়ে নেওয়ার আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। এবিজি স্পোর্টস সিটিতে যে চারাগাছ রোপিত হয়েছে, অচিরেই সেটা বট-অশথের ন্যায় বিশাল মহিরুহে পরিণত হবে।

এবিজি স্পোর্টস সিটিতে অবস্থিত বসুন্ধরা কিংস অ্যারিনা জন্মলগ্ন থেকেই এএফসি ও ফিফা কর্তৃক স্বীকৃত। এখানে বিশ্বকাপ ফুটবলের বাছাই পর্বের ম্যাচ, এএফসি কাপের ম্যাচ এবং সাফ অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবল টুর্নামেন্ট অত্যন্ত সুন্দর ও সার্থকভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মালয়েশিয়া ছাড়াও ক্রিকেটের পরাশক্তি ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দলগুলোর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম ছাড়া আরও একটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে দ্রুতগতিতে। ইতোমধ্যে ফ্লাডলাইট ও গ্যালারি নির্মাণ শেষ হয়েছে। আশা করি ২০২৭ সালের মধ্যে এ স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ সম্পূর্ণরূপে শেষ হবে। ফুটবল-ক্রিকেটের মতো বহুলপরিচিত খেলা ছাড়াও এবিজি আগামীর বাংলাদেশস্পোর্টস সিটিতে স্বল্প এবং অপ্রচলিত অনেক খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে আন্তর্জাতিক মানের সুইমিংপুল যেমন আছে তেমন আছে আন্তর্জাতিক মানের বাস্কেটবল কোর্টও; যেখানে নিয়মিতভাবে বাস্কেটবলের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। স্পোর্টস সিটির জুলকান অংশে বক্সিং এবং স্কোয়াশ কোর্টে কয়েকটি আন্তর্জাতিক আসর বসেছে ইতোমধ্যে। হকি স্টেডিয়ামের আস্ট্রোটার্ফ স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপও তাঁদের সেই দূরদর্শী পরিকল্পনা ও অনুপ্রেরণারই একটি অংশ। আনভীর বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান সায়েম সোবহান আনভীরের পরিকল্পনা ও অনুপ্রেরণায় এ উদ্যোগের আত্মপ্রকাশ। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ক্রীড়াচর্চা আরও সমৃদ্ধ হবে, নতুন প্রতিভা উঠে আসবে এবং একদিন এ মঞ্চ থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়রা তামিম ইকবাল কিংবা তপু বর্মণদের মতো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে নিয়ে আসবে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ফুটবল ও ক্রিকেটের সম্পর্ক অন্তহীন গভীর। দেশের অসংখ্য তরুণ এসব খেলায় অংশ নিয়ে তাঁদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সুপরিকল্পিত ও প্রতিযোগিতামূলক আয়োজন তাঁদের সেই প্রকাশের সুযোগকে আরও ব্যাপ্তিময় করে তুলতে পারে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা, পারস্পরিক পরিচিতি ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এ আয়োজন ক্যাম্পাসভিত্তিক ক্রীড়া সংস্কৃতিকে আরও প্রাণবন্ত করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক সময় যথাযথ প্রশিক্ষণ, নিয়মিত প্রতিযোগিতা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়রা নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরার অনুকূল সুযোগ পান না। এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের মতো এমন একটি প্রতিযোগিতা তরুণ খেলোয়াড়দের প্রতিভা বিকাশ এবং নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ের যোগ্য খেলোয়াড় উঠে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। তাই এ টুর্নামেন্টের তাৎপর্য শুধু সফলভাবে সম্পন্ন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত ক্রীড়াচর্চার অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলার মধ্যেও নিহিত। নিয়মিত প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের অনুশীলনে আগ্রহী করে, দল গঠনে উৎসাহ জোগায় এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ক্রীড়া কার্যক্রমে আরও সক্রিয় হওয়ার সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে মাঠের অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের সময়ানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ, দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং প্রতিপক্ষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণাবলি অর্জনে সহায়তা করে। এভাবেই একটি প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণ সমাজ দেশের অন্যতম প্রধান সম্পদ। তাঁদের মেধা, উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও খেলাধুলার সমন্বিত বিকাশ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এ তরুণরাই আগামী দিনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন, নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবেন এবং দেশের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবেন। তাই তাঁদের সুস্থ প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া, আত্মবিশ্বাস বাড়ানো এবং ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা কেবল ক্রীড়াঙ্গনের দায়িত্ব নয়, এটি বৃহত্তর সামাজিক উন্নয়নেরও একটি অংশ। তারই অংশ হিসেবে আমাদের এ প্রয়াস। এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ তাই শুধু মাঠের জয়পরাজয়ের গল্প নয়, এটি তারুণ্যের স্বপ্ন, ঐক্য, শৃঙ্খলা আর এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের প্রতিচ্ছবি। তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে আরও সমৃদ্ধ করার এ প্রত্যাশাই এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপের মূল তাৎপর্য।
এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটবল ও ক্রিকেট দল এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় ক্যাম্পাসভিত্তিক ক্রীড়াচর্চার পাশাপাশি আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি নতুন পরিসর তৈরি হবে। এ প্রতিযোগিতার উল্লেখযোগ্য প্রাইজমানি টুর্নামেন্টটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে। সর্বমোট ৩০ লাখ টাকার প্রাইজমানি থাকছে দুই বিভাগের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের জন্য। এই আর্থিক সম্মাননা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব জাগিয়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের দক্ষতা প্রমাণে বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাবে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের খেলাধুলায় এমন আয়োজন ও পুরস্কারের সমন্বয় শিক্ষার্থীদের কাছে ক্রীড়াকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।
