তেলবাহী জাহাজ রক্ষায় লোহিত সাগরে ফ্রান্সের নৌ টহল

অনলাইন ডেস্ক
ইয়েমেনের হুতিদের হুমকির মধ্যে লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তায় নৌ-টহল জোরদার করেছে ফ্রান্স।

গত এক সপ্তাহে একটি ফরাসি যুদ্ধজাহাজ অন্তত ১০টি জাহাজকে বাব আল-মানদেব প্রণালি পার হতে নিরাপত্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছে ফরাসি সামরিক বাহিনী।

ফরাসি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জেভিয়ের রিভাল জানান, ওই যুদ্ধজাহাজটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) লোহিত সাগরভিত্তিক নৌ মিশনের অংশ। হুতিদের হামলার হুমকি থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ রক্ষা এবং এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই এ মিশনের লক্ষ্য। ফরাসি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, ইইউর ‘অ্যাসপিডেস’ মিশনের আওতায় ফরাসি যুদ্ধজাহাজগুলো বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে পারাপারে সহায়তা করছে।

ফ্রান্সের সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাসপিডেস মিশন শুরু হওয়ার পর ফরাসি যুদ্ধজাহাজগুলো ১৫০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহেও একাধিক জাহাজকে বাব আল-মানদেব এলাকায় পাহারা দিয়ে পার করে দেওয়া হয়েছে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রণে বাব আল-মানদেব
লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত বাব আল-মানদেব বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ প্রণালির মধ্য দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনের হুতিরা প্রণালিটির আশপাশে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করায় বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা ইয়েমেনের মোখা বন্দর ও লোহিত সাগরের কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাব আল-মানদেবের ওপর তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে। এ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক বাণিজ্যের আনুমানিক ১২ শতাংশ পণ্য পরিবহন হয়।

হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকির কারণে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের তেল রফতানিও ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশেষ করে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। সৌদি তেলবাহী কিছু জাহাজকে নিজেদের অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে চলাচল করতেও দেখা গেছে।

ইয়ানবুতে ফরাসি সেনা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি অবকাঠামোর নিরাপত্তায় সরাসরি সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রান্স।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ গত ২৪ সেপ্টেম্বর জানান, সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু বন্দরের নিরাপত্তায় ফ্রান্স সেনাসদস্য, রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠাবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এর উদ্দেশ্য কোনও যুদ্ধে জড়ানো নয়; বরং গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনাটি সুরক্ষিত রাখা।

ইয়ানবু সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রফতানি কেন্দ্র। হরমুজ প্রণালিতে চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর সৌদি আরবের জন্য ইয়ানবুর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ, এ বন্দর ব্যবহার করে দেশটি হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রফতানি করতে পারে। কিন্তু হুতিদের হামলার হুমকি এখন সেই বিকল্প রুটকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর দেশটির প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইয়ানবু ও সংশ্লিষ্ট জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। সামরিক মুখপাত্র রিভালের ভাষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এখনও সমন্বয় চলছে।

জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা
লোহিত সাগরে হুতিদের হুমকি নতুন নয়। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার পর ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় দেশগুলো সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় সামরিক জাহাজ মোতায়েন করে আসছে। ফরাসি নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলো এর আগে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করা ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংসও করেছে।

ইইউর অ্যাসপিডেস মিশনের আওতায় ফরাসি নৌবাহিনীর পাশাপাশি অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের যুদ্ধজাহাজও লোহিত সাগরে কাজ করছে। আগস্ট পর্যন্ত মিশনটি ২ হাজার ৩৯০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপদে চলাচলে সহায়তা এবং ৭২০টির বেশি জাহাজকে সরাসরি নিরাপত্তা দিয়েছে বলে জানিয়েছিল।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের সামরিক তৎপরতা এবং বাব আল-মানদেবের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। ফলে জাহাজগুলোকে নিরাপদে পারাপারে সামরিক পাহারার পাশাপাশি সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামো রক্ষাও এখন ইউরোপীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠছে।

ফ্রান্সের এ তৎপরতার ফলে একদিকে বাব আল-মানদেব দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা জোরদার হচ্ছে, অন্যদিকে সৌদি আরবের ইয়ানবু তেল রফতানি কেন্দ্রের নিরাপত্তাতেও ইউরোপীয় সামরিক সহায়তা বাড়ছে। লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব ও সৌদি তেল অবকাঠামো ঘিরে হুতিদের হুমকি অব্যাহত থাকায় গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ ও জ্বালানি করিডরের নিরাপত্তা এখন আঞ্চলিক উত্তেজনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights