দায়ী না হয়েও হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের জোরালো উদ্যোগ
দায়ী না হয়েও দেশে হানা দেয়া হাম মোকাবিলা, চিকিৎসাসহ ব্যবস্থাপনার দায় সরকারকেই নিতে হচ্ছে। দোষারোপ করে এ দায় এড়াচ্ছেও না সরকার। দেশব্যাপী শুরু করেছে হাম-রুবেলার জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। এ কর্মসূচির আওতায় ১৮ জেলার ৩০ উপজেলা ও চারটি সিটি করপোরেশনসহ সব এলাকা মিলিয়ে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেবে সরকার।
৫ এপ্রিল প্রথম ধাপে শুরু হওয়া টিকা কর্মসূচি ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। আর ১২ এপ্রিল শুরু হওয়া কর্মসূচি চলবে আগামী ১২ মে পর্যন্ত। যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এ সময়ে টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সেইসাথে বলা হয়েছে প্রথম ডোজ নেওয়ার পর চার সপ্তাহ পূর্ণ না হলে হামের টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে।
এক সময় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সেরা হলেও এখন মাঠকর্মীর কী ঘাটতি তা হামের প্রাদুর্ভাব না হলে হয় তো দৃশ্যমান হতো না। মানুষের জানাও হতো না। মূলত একটি ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ডের বিপরীতে একজন স্বাস্থ্য সহকারী কর্মরত থাকেন। অনেক জায়গায় পদ শূন্য থাকায় পার্শ্ববর্তী এলাকার কর্মীরা এসে দায়িত্ব পালন করেন। এ অবস্থার মধ্যেই অনিবার্যভাবে টিকার কাজ চালাতে হচ্ছে সরকারকে। এ শূন্যতা পূরণে স্বাস্থ্য বিভাগে ১ লাখ নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। এই ১ লাখের মধ্যে স্বাস্থ্য সহকারীসহ টেকনিশিয়ান, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি-সব খাতের জনবলই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। জনবল কম থাকলেও সমন্বিত প্রচেষ্টায় টিকাদান ব্যাহত হচ্ছে না বলে নিশ্চিত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। জানান, বিভিন্ন বিভাগের কর্মীরা একযোগে কাজ করায় সেবা সফলভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। বাংলাদেশে গত দেড় দশকে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য। গত কিছুদিনে কী কারণে হামের এ আকস্মিক হানা?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পর্যক্ষেণ হচ্ছে, বেশ কিছুদিন ধরে টিকা কার্যক্রমে গাফিলতি চলেছে। হামের টিকা কেনা নিয়ে অহেতুক ও অপ্রত্যাশিত জটিলতা তৈরি করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে। বলতে গেলে শিশুদের টিকা কার্যক্রম প্রায় বন্ধই থেকেছে। ঘটনার সূত্রপাত অবশ্য এরও আগে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসেই হাম ও রুবেলার শেষ কার্যক্রমটি চলেছিল, যেখানে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়ার আওতায় আনা হয়। এরপর সেই সরকারকেও আর এ উদ্যোগ নেয়নি। মানে হামের এই মারাত্মক প্রকোপ নিয়ে বিগত দুই সরকার অবহেলা করেছে। কেস স্টাডিতে হামের উপসর্গ নিয়ে যেসব শিশু এবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, তার বড় অংশের বয়স ৯ মাসের কম। টিকার সূচি অনুযায়ী ৯ মাসের আগে কোনো শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয় না। যেসব শিশুকে ছয় মাস বয়স থেকে ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ দেওয়া হয়, তাদের হামে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়। শিশুর শরীরে ভিটামিন ‘এ’র মজুত পর্যাপ্ত থাকলে হাম তাদের সহজে কাবু করতে পারে না। তাদের অন্য কিছু রোগ প্রতিরোধের শক্তিও বেড়ে যায়। কিন্তু ভিটামিন ‘এ’র ঘাটতি থাকলে হামে আক্রান্ত শিশুর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ অন্যান্য নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়, যার পরিণতি মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে। অন্ধত্বেরও ঝুঁকি থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশুদের ছয় মাস পর পর ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর তাগিদ এ কারণেই। বাস্তবতা বুঝে বিগত প্রায় সব রাজনৈতিক সরকারই টিকা কার্যক্রমকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছিল। সাধারণ মানুষও টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে সাড়া দিয়েছে ব্যাপক উৎসাহের সঙ্গে।
হিসাব বলছে, শিশুরা ২০২৪ সালের জুন মাসের পর থেকে নিয়মিত ছয় মাসের ব্যবধানে ভিটামিন ‘এ’র টিকা আর পাচ্ছে না। ২০২৪ সালের জুনের পর তারা ভিটামিন ‘এ’ পেয়েছে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে, অর্থাৎ ছয় মাসের বদলে ৯ মাস পর। এরপর আবার এ পর্যন্ত প্রায় ১৩ মাস এই টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তার ওপর কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রমও শিথিল হয়ে পড়েছে। এসবের জেরে হাম এবার হামের এ রুক্ষ চেহারা। হামের ভয়াবহতার পেছনে অপুষ্টিও একটি বড় কারণ। করোনা মহামারির পর হামের ভয়াবহতায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে আবারও একটা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। করোনা মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে বাংরাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা। বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতি-অব্যবস্থাপনার চিত্র। বেরিয়ে আসে স্বাস্থ্যখাতে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতি। স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, অনিয়ম ও জনবলসংকট পাওয়া যাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও। বিশেষ করে টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অভিযোগ খুব জোরালো।
স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর ঐকান্তিক ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বে টিকাদান কর্মসূচিতে সুনাম অর্জন করেছে। যক্ষ্মায় রক্ষা নেই-এর মতো ভীতিকর স্লোগানও এখন অতীত। টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য থাকলেও নানা সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল। তখন দুর্গম অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সীতাকুণ্ডের সেই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি, যার কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ও সেখানে দুটি জাতিগোষ্ঠীর ৯টি শিশুর মৃত্যু হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ডেটাবেস বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার হার ছিল প্রতিবছর ৯৭ শতাংশ। এরপরও গত এক যুগে এ কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে ৪ হাজার, ২০১৯–এ প্রায় ৬ হাজার আর বাকি দুই বছরে দুই সহস্রাধিক করে। এ বছরের প্রাদুর্ভাবের পুরো চিত্র এখনো পাওয়া যায়নি। সঠিক তথ্যেরও যথেষ্ট ঘাটতি আছে। গত বছর টিকাদানের হার আগের বছরগুলোর তুলনায় ২০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে প্রকাশ পেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) কর্তৃপক্ষের দাবি, এ তথ্য সঠিক নয়; এটি এখনো পুরোপুরি আপডেট হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব দুই-তিন বছরে ফিরে আসার প্রবণতা ছিল। তবে টিকাদান কর্মসূচির উন্নতির ফলে সেই ব্যবধান এখন অঞ্চলভেদে ৫-১০ বছরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রাদুর্ভাবগুলোর মাত্রাও ছোট হয়ে এসেছে। তবে এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছোট–বড় মাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে ভারতে হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশটিতে ১২ হাজারের বেশি কেস পাওয়া গেছে। পাকিস্তানেও হামের বিস্তার ঘটেছে (প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কেস)। ইন্দোনেশিয়াতেও শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ বেড়েছে (প্রায় ৮ হাজার ৯০০ কেস)। আফ্রিকা মহাদেশে অ্যাঙ্গোলা, ইয়েমেন, ক্যামেরুন ও সুদানের মতো দেশে হামের বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আফ্রিকাতে আক্রান্ত শিশুদের ৩ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত মারা যাচ্ছে। ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার ৫ শতাংশের ওপরে। মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন প্রদেশ এবং রোমানিয়া, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রিয়ায় ছোট ছোট ক্লাস্টারে হাম ছড়িয়ে পড়েছে। তৃতীয় বিশ্বের দুর্নীতিগ্রস্ত দেশে স্বভাবতই এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই ব্যর্থতার আঙুলটা ওঠে সরাসরি সরকারের দিকে। ১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তায় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচএনপিএসপি) চালু হয়। এর আগপর্যন্ত টিকাদান কার্যক্রমসহ জনস্বাস্থ্যের অন্যান্য কার্যক্রম চলত শতাধিক প্রকল্পের মাধ্যমে। সেগুলো এইচএনপিএসপির অধীনে নিয়ে আসা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে চতুর্থ ধাপের এইচএনপিএসপি শেষ হয়। ওই বছরের জুলাই মাসেই পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য ১ লাখ ৬ হাজার ১০০ কোটি টাকার পঞ্চম এইচপিএনএসপি শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় তা অনুমোদন করেনি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বর্তমান বিএনপি সরকার মেয়াদ বিবেচনায় এখনও শিশু। সরকার পরিচালনার শুরুতেই হামের এ প্রাদুর্ভাব তাদেরকে একটা কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে। ভালো দিক হচ্ছে, যত দোষ তারা গেল দুই সরকারের ঘাড়ে দিয়ে নিজেরা দায় এড়াচ্ছে না। দায়িত্ব নিয়ে সর্বসাধ্য দিয়ে চেষ্টা করছে তা মোকাবিলার।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
