নরওয়ে-রাশিয়া সীমান্তে ক্রমেই বাড়ছে বিভাজন, সংকটে আদিবাসী জনগোষ্ঠী
অনলাইন ডেস্ক
নরওয়ে-রাশিয়া সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় হাইকিংয়ের সময় পর্যটক গাইড হেনরিক হফম্যান; এই পথে খুব কমই অন্য বেসামরিক মানুষের দেখা পান তিনি। ছবি: আল-জাজিরা থেকে সংগৃহীত
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে নরওয়ে ও রাশিয়ার সীমান্তে নিরাপত্তা কড়াকড়ি বেড়েছে। এতে দুই দেশের সীমান্তজুড়ে বসবাসকারী আদিবাসী সামি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক যোগাযোগে তৈরি হচ্ছে নতুন বাধা।
সীমান্তের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা পরিবার, বন্ধুত্ব, ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঐতিহ্যবাহী পশুপালন এখন ক্রমেই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার চাপে পড়ছে।
নরওয়ের উত্তরাঞ্চলীয় ফিনমার্ক কাউন্টির নেইডেন ফিয়র্ড এলাকায় সামি জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের আদি আবাসভূমি সামি বা সাপমি উত্তর নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং রাশিয়ার কোলা উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত। ১৮২৬ সালে নরওয়ে ও রাশিয়ার সীমান্ত নির্ধারিত হওয়ার পর থেকেই এই জনগোষ্ঠী দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
একসময় সীমান্তের ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারীদের ভিসা ছাড়াই যাতায়াতের সুযোগ ছিল। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার হামলা শুরুর পর সেই যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। নিরাপত্তা উদ্বেগের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্কের অবনতিও এর কারণ।
স্থানীয় সামি বাসিন্দা নিলস বোইনে জানান, আগে তারা রাশিয়ায় কেনাকাটা করতে যেতেন, এমনকি সাপ্তাহিক ছুটিও কাটাতেন সেখানে। এখন পরিচিতজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও সতর্ক থাকতে হয়। রাশিয়ায় এক স্থানীয় ব্যবসায়ী গ্রেফতার হওয়ার পর সীমান্ত পারাপার নিয়ে মানুষের ভয় আরও বেড়েছে।
রুশ পর্যটকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১৯ সালে নরওয়েতে রাশিয়া থেকে আসা পর্যটকের সংখ্যা ছিল আড়াই লাখ; গত বছর তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫২ হাজারে। এতে সীমান্ত এলাকার অনেক দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আয় হারিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে।
সীমান্তে নিরাপত্তা বাড়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত সমস্যাও সামি জনগোষ্ঠীর জীবনকে কঠিন করে তুলছে। রাশিয়া-নরওয়ে সীমান্ত এলাকায় জিপিএস সংকেত বাধাগ্রস্ত বা বিকৃত হওয়ায় সামি পশুপালকদের রেইনডিয়ার বা বল্গাহরিণের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে অনেকে এখন জিপিএসের বদলে মোবাইল নেটওয়ার্কভিত্তিক ট্র্যাকার ব্যবহার করছেন।
শীতকালে নদী জমে গেলে রেইনডিয়ার বরফের ওপর দিয়ে রাশিয়ায় চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ২০২৩ সালে আট মাসে ৪২টি রেইনডিয়ার রাশিয়ায় চলে যাওয়ার পর সীমান্তের ১৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়ার একটি অংশ সংস্কারের উদ্যোগ নেয় নরওয়ে।
তবে স্থানীয় পশুপালকদের মতে, যুদ্ধ থাকুক বা না থাকুক, রেইনডিয়ার সীমান্ত পার হবেই। কারণ, প্রাণীরা রাষ্ট্রীয় সীমান্ত বোঝে না।
সীমান্ত বিভাজনের প্রভাব পড়েছে সামি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পেও। ‘দুওদি’ নামে পরিচিত এসব শিল্পকর্মে রেইনডিয়ারের শিং ও বার্চগাছের কাঠের মতো স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
আগে সীমান্তের দুই পাশের কারিগরেরা সহজেই পণ্য আদান-প্রদান ও বিক্রি করতে পারতেন। এখন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতায় সেই সুযোগ কমেছে।
সামি পার্লামেন্টারি কাউন্সিলের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হাকোন মুদেনিয়া বলেছেন, সীমান্তের বাধা সাংস্কৃতিক বিনিময় ও বাণিজ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এতে সামি সংস্কৃতির বস্তুগত ভিত্তিও দুর্বল হচ্ছে।
নরওয়ের স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মারিউস মেইসফিয়র্ড ইয়োসেভল্ডও স্বীকার করেছেন, রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আন্তসীমান্ত সহযোগিতার সুযোগ সীমিত করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সামি জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিভাজন শুধু ভৌগোলিক নয়; এটি তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও বহু প্রজন্মের সামাজিক সম্পর্কের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে। সূত্র: আল-জাজিরা
