পশ্চিমা সামরিক ঘাটির কাছেই ট্রোজান হর্স, ন্যাটোতে রাশিয়ার অভিনব নজরদারি
অনলাইন ডেস্ক
পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে ছদ্মবেশী যুদ্ধ চালাতে বাল্টিক অঞ্চলের একঝাঁক অবকাশযাপন কেন্দ্র বা রিসোর্টকে ‘ট্রোজান হর্স’ হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া। ডেইলি টেলিগ্রাফের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। কৌশলগত সামরিক ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর একদম কাছে অবস্থিত সুইডেন, লিথুয়েনিয়া এবং নরওয়ের শত শত রুশ-সংযুক্ত সম্পত্তির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে শুরু করেছেন পশ্চিমা কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি দেখা গেছে সুইডেনে। দেশটির কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ মুস্কো নৌঘাঁটির প্রবেশদ্বারে অবস্থিত রুশ ধনকুবেরের একটি সম্পত্তিকে ইতোমধ্যে ‘গুরুত্বপূর্ণ হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া লিথুয়েনিয়ার শিয়াউলিয়াই জোকনিয়াই ও পানেভেজিস পাজুওস্তিস ন্যাটো বিমানঘাঁটির কাছে এবং নরওয়ের বার্দুফোস বিমানঘাঁটি যেখানে দেশটির অন্যতম প্রধান সামরিক স্থাপনা ও এফ-থার্টিফাইভ যুদ্ধবিমান সংরক্ষিত থাকে, তার ঠিক বিপরীতে ক্রেমলিন-যুক্ত ব্যক্তিদের কেনা বেশ কিছু কটেজ বা কেবিন পাওয়া গেছে।
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর এসব সম্পত্তি ব্যবহার করে ন্যাটো মিত্রদের বিরুদ্ধে ড্রোন হামলা চালানো হতে পারে কিংবা নাশকতা ও গোয়েন্দা নজরদারির ঘাঁটি হিসেবে এগুলোকে ব্যবহার করা যেতে পারে। মস্কোর দিন দিন বিস্তৃত হতে থাকা হাইব্রিড যুদ্ধ অভিযানেরই অংশ এটি, যার মাধ্যমে সম্প্রতি লন্ডনে ও ওয়ারশতে কারখানায় নাশকতা চালানো এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া প্রতিরক্ষা নির্বাহীদের ওপর হামলার চেষ্টা চালানো হয়েছে।
টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে যে সুইডেনের মুস্কো নৌঘাঁটির কাছে সাতটি শোবার ঘরবিশিষ্ট একটি বিশেষ সম্পত্তির মালিক তাতিয়ানা সাজোনোভা। তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও রুশ ধনকুবের স্ত্যানিস্লাভ আলেশচেঙ্কোর স্ত্রী। সুইডিশ ল্যান্ড রেজিস্ট্রি নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৪ আগস্ট ১৮.৬ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনা দিয়ে সম্পত্তিটি কেনা হয়, যা রাশিয়াকে সুইডেনের জন্য সরাসরি বড় হুমকি হিসেবে গণ্য করার অনেক আগের ঘটনা।
সুইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পল জনসন ডেইলি টেলিগ্রাফকে জানিয়েছেন, তার সরকার এই ‘কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সম্পত্তিটি’ বাজেয়াপ্ত করবে, কারণ এর মালিককে মুস্কো ঘাটির জন্য সরাসরি ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, এই এলাকায় এটিই একমাত্র স্থান যা সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে নেই, ফলে এটি নৌঘাঁটির নিরাপত্তায় একটি বড় সংকট তৈরি করেছে। বর্তমানে সম্পত্তিটি এক রুশ নাগরিকের মালিকানাধীন, যাকে সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, বিশেষ করে দিন দিন ড্রোন হামলা ও নজরদারির হুমকি যেভাবে বাড়ছে, তা মোকাবিলা করে এই কৌশলগত নৌঘাঁটি রক্ষা করতে হলে ওই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ বা প্রবেশাধিকার অর্জন করা জরুরি।
এদিকে লিথুয়েনিয়ার সাবেক রাষ্ট্রদূত ও হাইব্রিড হুমকি বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ইটভিডাস বাজারুনাস বলেন, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে চরম উদ্বেগ রয়েছে যে রাশিয়া এই সম্পত্তিগুলোর মালিকানা বা ছদ্মবেশী প্রতিনিধি ব্যবহার করে এক ধরণের ‘ট্রোজান হর্স’ তৈরি করছে। তা যে শুধু তাৎক্ষণিক সামরিক অভিযানের জন্য তা নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, প্রভাব বিস্তার বা এমনকি বড় কোনো সংকটকালে নাশকতার প্রস্তুতির জন্যও ব্যবহার হতে পারে। ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রুশ হাইব্রিড যুদ্ধ নিয়ে কাজ করা এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা আরও বলেন, কোনো সংকট দেখা দেওয়ার আগেই আমাদের সামরিক ও কৌশলগত অবকাঠামোর চারপাশের এই ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ হিসেবে এসব বিধিনিষেধ আনা হচ্ছে।
ডেইলি টেলিগ্রাফ চলতি মাসে মুস্কোর ওই বাড়িতে গিয়ে দেখেছে যে এটি কাঠ দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছে এবং চারপাশ মাচা দিয়ে ঢাকা। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, কৌতুহলী মানুষজন যাতে অনধিকার প্রবেশ না করতে পারে, সেজন্য মালিক পক্ষ ঘেরাও দিয়েছে। সুইডিশ সামরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাড়িটি সংস্কারের অংশ হিসেবে ডিনামাইট ফাটিয়ে মাটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড বেসমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় দেড় বছর ধরে এই সংস্কার কাজ চলছে এবং ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মালিককে আর দেখা যায়নি। বাড়ির মালিক সাজোনোভা আগে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন যে তিনি কেনাকাটার সময় সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতেন না, যদিও নতুন মন্তব্যের জন্য টেলিগ্রাফের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি।
সুইডিশ সশস্ত্র বাহিনী নাম প্রকাশ না করে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছে যে এই সম্পত্তির মালিকরা সেনাসদস্যদের জন্য হুমকি। স্থানটি স্বাধীনভাবে যাচাই করে দেখেছে টেলিগ্রাফ, যা মুস্কো দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত এবং এটি নৌঘাঁটি থেকে মাত্র পাথর ছোঁড়া দূরত্বে। একটি অনলাইন প্রোপার্টি লিস্টিং অনুযায়ী, এই বাড়িটিতে সাতটি বেডরুম, তিনটি বাথরুম, একটি নুড়ি পাথরের সৈকত এবং স্পিডবোট ভেড়ানোর জেটি রয়েছে।
ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই ধরনের রুশ সম্পত্তির নেটওয়ার্ক ভবিষ্যতে ড্রোন হামলার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে বলে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির গাম্ভীর্য অনুধাবন করে লিথুয়েনিয়া সরকার ইতোমধ্যে নতুন আইন পাস করেছে, যাতে কোনো রাশিয়ান নাগরিক স্পর্শকাতর স্থানগুলোর কাছে জমি বা সম্পত্তি কিনতে না পারে। লিথুয়ানিয়ার কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে রুশ-সংযুক্ত ব্যক্তিরা শিয়াউলিয়াই জোকনিয়াই ও পানেভেজিস পাজুওস্তিস বিমানঘাঁটি, রুকলার গাইজিউনাই সামরিক প্রশিক্ষণ এলাকা, ভিলনিয়াস ও পালঙ্গা বিমানবন্দরসহ অন্যান্য স্পর্শকাতর এলাকায় সম্পত্তি কিনেছে। এর মধ্যে শিয়াউলিয়াই বিমানঘাঁটি ন্যাটো এয়ার পলিসিং মিশনের মূল কেন্দ্র হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
লিথুয়ানিয়ার প্রবীণ সংসদ সদস্য মিনডাগাস লিঙ্গে বলেন, আমরা ইতিমধ্যেই পশ্চিম ইউরোপের অন্যত্র রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত মালিকদের কেনা সম্পত্তিকে উসকানি ও গোপন অভিযানের জন্য ব্যবহার হতে দেখেছি। রাশিয়া ও বেলারুশের সীমান্তবর্তী প্রথম সারির ন্যাটো দেশ হিসেবে লিথুয়ানিয়াতেও যে একই চেষ্টা করা হচ্ছে না, তা ভাবা বোকামি হবে। জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মূল বিষয় কেউ কেন সম্পত্তি কিনেছে তা নয়, বরং এটি কী কাজে ব্যবহার হতে পারে তা দেখা। সামরিক ঘাঁটি বা অন্যান্য কৌশলগত সাইটের পাশের সম্পত্তি পর্যবেক্ষণ পোস্ট, সরঞ্জাম সংরক্ষণের জায়গা বা ড্রোন ও নাশকতার জন্য উৎক্ষেপণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
একইভাবে নরওয়ের বরফাবৃত উত্তরাঞ্চলের বার্দুফোস সামরিক ঘাঁটির কাছে অবস্থিত একটি শীতকালীন স্পোর্টস রিসোর্টে ২০১০ সাল থেকে একাধিক কেবিনের মালিকানা রুশ নাগরিকদের হাতে রয়েছে। সুইডেনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমানে নর্ডিক এয়ার ডিফেন্সের পরিচালক টোবিয়াস বিলস্ট্রোম বলেছেন, সুইডেন ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পর থেকে মস্কো স্পষ্টভাবেই তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করছে। তারা সুইডেন ও বাল্টিক দেশগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে এবং নিজেদের গোয়েন্দা স্বার্থ জোরদার করতে তৎপরতা বাড়িয়েছে। মুস্কোতে সাধারণ ছুটির দিনের বাড়ির ছদ্মবেশে যা কেনা হয়েছে, তা রাশিয়ার অত্যন্ত পুরনো একটি কৌশল।
শুধু সাধারণ বাড়ি বা কটেজই নয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ছদ্মবেশকেও গোয়েন্দাগিরির কাজে ব্যবহার করছে রাশিয়া। সেন্ট্রাল সুইডেনের ভেস্টেরাস শহরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের ঠিক উল্টো দিকে অবস্থিত একটি রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আইনি লড়াই চালাচ্ছে সুইডিশ কর্তৃপক্ষ। গোয়েন্দা তথ্য বলছে, গির্জাটিকে কাছের বিমানবন্দরে নজরদারির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছিল। তা ছাড়া সুইডিশ চার্চগুলোকে রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চের কাছে অফিস স্পেস ভাড়া না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়া তথাকথিত ‘স্পাই নান’ বা গোয়েন্দা সন্ন্যাসীদের ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বেলারুশের সেন্ট এলিজাবেথ কনভেন্টের বেশ কয়েকজন নান সুইডিশ গির্জায় গিয়ে নিজেদের প্রচারণা চালিয়েছেন, যাদের পরবর্তীতে রাশিয়ার সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর সাথে সম্পৃক্ততা এবং ইউক্রেন আক্রমণের প্রকাশ্য সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সংঘাতপ্রবণ এলাকায় জ্যাকেট পরে তাদের যুদ্ধের সমর্থনে কাজ করতে দেখা গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুইডিশ সরকার ইতোমধ্যে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করেছে। দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করে এমন বিদ্যমান সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে নতুন আইন আনার প্রক্রিয়া চলছে। সুইডেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পল জনসন নিশ্চিত করেছেন যে, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে নতুন আইন কার্যকর হয়েছে, যা নিরাপত্তা-সংবেদনশীল কোনো সম্পত্তির হস্তান্তরের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং জোরদার করেছে এবং অযোগ্য বা ঝুঁকিপূর্ণ আবেদনকারীদের কাছে সম্পদ হস্তান্তর সরাসরি বন্ধ করার আইনি ক্ষমতা দিয়েছে। রাষ্ট্র যাতে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো বিদেশি অধিগ্রহণ খতিয়ে দেখতে এবং প্রয়োজনে তা আটকে দিতে পারে, সে লক্ষ্যেই নতুন এই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
