প্রদীপ নিভছে ঐতিহ্যবাহী ক্যাফে ‘মৌরিয়া’র
অনলাইন ডেস্ক
রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী কিংবা বিপ্লবী; গত কয়েক দশক ধরে যাদের আড্ডা আর মুক্তচিন্তার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল গ্রিসের এথেন্সের ক্যাফে মৌরিয়া। এবরা সেই ক্যাফেটিই বন্ধ হতে চলেছে।
প্রায় ৪৪ বছর ধরে এই ঐতিহাসিক ক্যাফের দরজা সব ধরনের মানুষের জন্য খোলা রেখেছিলেন এর স্বত্বাধিকারী ক্রিস্টোস ভানাস। মধ্য এথেন্সের বামপন্থী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র বলে পরিচিত এক্সারচিয়া এলাকার এই কাফেটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বাড়িওয়ালা আর তা নবায়ন করতে রাজি হননি। ফলে এক আবেঘন পরিবেশের মধ্য দিয়ে চিরতরে বন্ধ হতে যাচ্ছে শতবর্ষের স্মৃতিবিজড়িত এই প্রাচীন আড্ডাস্থল।
প্রতিদিন সকাল সাতটা বাজলেই দরজার তালা খুলে গ্রাহকদের সেবায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন প্রবীণ ক্রিস্টোস। শনিবারের সকালে তো আরও আগেই, অর্থাৎ ভোর পাঁচটা থেকেই বাজারের বিক্রেতাদের শরীর গরম করার জন্য ঐতিহ্যবাহী অ্যালকোহল পরিবেশন শুরু হতো সেখানে। তবে রবিবারের পর থেকে আর সেই পরিচিত দৃশ্য দেখা যাবে না। ক্যাফের নিয়মিত দর্শনার্থীদের মতে, ক্যাফে মৌরিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া যেন কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে হারানোর সমান। এথেন্সের বুক থেকে একটি নিছক চায়ের দোকান হারিয়ে যাওয়া নয় বরং এটি প্রাচীন এক ঐতিহ্যের অবসান।
বিগত এক দশকে গ্রিসে পর্যটকদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে। আর তার ফলেই বদলে যেতে শুরু করেছে এক্সারচিয়ার মতো ঐতিহ্যবাহী ও প্রতিবাদী এলাকাগুলো। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং পর্যটকদের চাহিদা মেটাতে এলাকাটিতে একের পর এক আধুনিক বহুতল ভবন, শর্ট-টার্ম রেন্টাল অ্যাপার্টমেন্ট এবং অভিজাত দোকান গড়ে উঠছে। ক্যাফে মৌরিয়াকে কোনোমতে টিকিয়ে রাখতে এবং ঐতিহাসিক ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার মানুষ একটি অনলাইন পিটিশনে স্বাক্ষর করলেও শেষ রক্ষা হয়নি; গ্রিক সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এতে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।
ক্যাফের তরুণ স্বত্বাধিকারী আরেতি ভানাসের মতে, বিশ্বায়নের যুগে চারপাশের সবকিছু দ্রুত বদলে গেলেও ক্যাফে মৌরিয়া কখনোই তার মেনু কিংবা ঐতিহ্যে আপস করেনি। সেখানে কোনো আধুনিক কফি কিংবা স্প্রিটজের ছোঁয়া ছিল না, ছিল কেবল নস্টালজিয়ার টান। বর্তমান সময়ে যেভাবে এক্সারচিয়ার অলিগলি নিজেদের পরিচিতি হারিয়ে ফেলছে, তাতে স্থানীয় মানুষদের মধ্যে এক গভীর ক্ষোভ ও বিষাদ তৈরি হয়েছে। কেবল মৌরিয়াই নয়, দ্রুত পর্যটনকেন্দ্রিক বাণিজ্যায়নের কারণে গোটা গ্রিস জুড়েই ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এমন অনেক ঐতিহ্যবাহী আড্ডাস্থল। তবু মৌরিয়ার নিয়মিত গ্রাহকদের কাছে এই কাফেটি চিরকাল স্বস্তির নীড় এবং একটি ঐতিহ্যের প্রতীক হয়েই বেঁচে থাকবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
