বন্যপ্রাণীর অবাক জাদুঘর

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম
তাকের ভিতর ফণা তুলে দাঁড়িয়ে আছে খইয়া গোখরা সাপ। আছে গেছো ব্যাঙ, বাঘের বাচ্চা, ঘড়িয়ালে ডিম, জলপাইরঙা কাছিম, পাতি দুধরাজ, শঙ্খিনী। যেন এক টুকরা জঙ্গল। কী নেই এই অভিনব জাদুঘরে! এখানে আছে ৭৪ প্রজাতির ১২০টি মৃত প্রাণী। সব থরে থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। শুধু প্রদর্শনী নয়, এই জাদুঘরের মাধ্যমে শিক্ষা, গবেষণা এবং প্রজন্মকে সচেতনও করা হচ্ছে। জাদুঘরটি মৃত প্রাণীর মধ্য দিয়ে যেন জীবনের চিরন্তন গল্প শুনিয়ে যাচ্ছে। মহামারিচট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর এলাকায় বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) প্রশাসনিক ভবনের দ্বিতীয় তলায় রয়েছে এই অভিনব জাদুঘর। পাহাড়, বন ও বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদে ভরা পুরো আঙিনা। নগরের ভিতরেই সবুজ পরিবেশে গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘরটি। জানা যায়, ১৯৭৮ সালে বিএফআরআইয়ের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, বিলুপ্তপ্রায় ও দুর্লভ মৃত পশুপাখি সংগ্রহ করা হবে। উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্মৃতিচিহ্ন রাখা। সেই উদ্যোগ এখন পূর্ণতা পেয়েছে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ঘুরতে আসেন এখানে। তারা মৃত অথচ বৈচিত্র্যময় এসব প্রাণী দেখে মুগ্ধ হন। কেউ বিস্মিত হন। একটি ছোট কক্ষে বয়ামে করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে সব মৃতপ্রাণী। আছে গেছো ব্যাঙ, দুমুখো সাপ, বিষাক্ত গোখরো, কালিম পাখি, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, লালবুক টিয়া, চিত্রা হরিণের বাচ্চাসহ বিভিন্ন পশুপাখি। জাদুঘরে পাহাড়ি ময়না, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, পাতিহাঁস, লালবুক টিয়া, সবুজ টিয়া, সুন্দরী হাঁস, ভাতশালিক, ঝুঁটি শালিক, কালিম ও খইয়া গোখরা সাপ- সবই ট্যাক্সিডার্মি পদ্ধতিতে সংরক্ষিত। ট্যাক্সিডার্মি হলো চামড়া সংরক্ষণ করে নকল কাঠামোর ওপর বসিয়ে প্রাণীকে জীবন্তের মতো দেখানোর একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়াকে স্টাফিং বা প্রস্তুতকরণও বলা হয়। এটি সাধারণত গবেষণা, প্রদর্শন বা ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য করা হয়। মহামারিবিএফআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিয়মিত পশুপাখি সংগ্রহ করা হয়। এসব নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে এটি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। জাদুঘরটি দিনদিন সমৃদ্ধ হচ্ছে। দেশে দিনদিন গুইসাপ কমছে। তাদের বাসস্থান ধ্বংস হচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নগরায়ণের ফলে ঝুঁকির মুখে আছে এই গিরগিটি প্রজাতির প্রাণীটি। অথচ এটি পরিবেশের জন্য বেশ উপকারী। বিশেষ করে এটি ক্ষতিকর পোকামাকড়, ইঁদুর খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে। জাদুঘরে গুইসাপের একটি বাচ্চাও আছে। ১৯৯২ সালের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের মিরসরাই থেকে এটি সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গবেষণাসহ নানা কাজে এখানে পরিদর্শন করতে আসেন। পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রাণীগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। কাচের বয়ামে রাখা অধিকাংশ নমুনার ভিতরে ‘ফরমালডিহাইড দ্রবণ’ ব্যবহার করা হয়। প্রতিবছর এই দ্রবণ পরিবর্তন করা হয়, যাতে মৃত প্রাণী ‘বেঁচে থাকার’ মত শোভা ধরে রাখতে পারে। আগামীতে জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ করার পরিকল্পনা আছে।’ সরেজমিন দেখা যায় বাঘের বাচ্চা বা শাবক। তিন দিন বয়সে মারা গিয়েছিল শাবকটি। ১৯৯৯ সালের ১৯ মে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা থেকে বাচ্চাটি সংগ্রহ করা হয়। এরপর থেকে শাবকটির জায়গা হয় জাদুঘরে। চিত্রা হরিণের বাচ্চারও ঠিকানা হয়েছে জাদুঘরে। ১৯৯৭ সালের ১৬ মার্চ এটিও চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা থেকে আনা হয়। হরিণটি যেন বয়ামের ভিতর ভাসছিল। জাদুঘরের আরেক আঙিনা পাখিদের সংগ্রহশালা। কক্ষের এক কোনার তাকের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে লালবুক টিয়া ও ময়না। আছে কালিম বা বেগুনি জলচর পাখি। কালিম পাখিটি ২০১৭ সালের ৩ জুন ঢাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights