বাড়িতে চলছিল শেষকৃত্য, অতঃপর ‘অলৌকিক’ প্রত্যাবর্তন এভারেস্টে নিখোঁজ শেরপার!

অনলাইন ডেস্ক

বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টে ছয় দিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর এক নেপালি শেরপা গাইডকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে খুঁজে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল পরিবার ও উদ্ধারকারীরা। এমনকি পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর আশঙ্কায় শেষকৃত্যের ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাও শুরু করে দিয়েছিলেন।

তার নাম দাওয়া শেরপা। ৫২ বছর বয়সী এই গাইড নেপালের একজন অভিজ্ঞ শেরপা। বৃহস্পতিবার সকালে এভারেস্টের খুম্বু আইসফল এলাকার তুষারঢাকা ঢালে তাকে হামাগুড়ি দিতে দেখা যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।

দাওয়া শেরপার সন্ধানে সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান ‘৮কে এক্সপেডিশনস’ এর কর্মকর্তা পেম্বা শেরপা জানান, সাগরমাথা দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির একটি পরিচ্ছন্নতা দল তাকে প্রথম দেখতে পায়। দলটি পর্বতারোহীদের মৌসুম শেষে পর্বতে ব্যবহৃত দড়ি, মই ও অন্যান্য সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া এবং পরিবেশ পরিষ্কারের কাজ করছিল।

উদ্ধারকারীরা দাওয়া শেরপাকে গুরুতর শারীরিক দুর্বল অবস্থায় পান। তাকে দ্রুত খাদ্য ও পানি সরবরাহ করা হয় এবং পরে নিরাপদে বেস ক্যাম্পে নামিয়ে আনা হয়। সেখান থেকে একটি উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারে করে তাকে রাজধানী কাঠমান্ডুর হ্যামস হাসপাতালে নেওয়া হয়।

বাড়িতে চলছিল শেষকৃত্যের আচার
দাওয়া শেরপার স্ত্রী দামু শেরপা জানান, পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যে তাকে মৃত ভেবে ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের প্রস্তুতি শুরু করেছিলেন।

তিনি বলেন, “স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবং পরিচিত একজনের ফোনের মাধ্যমে প্রথম জানতে পারি যে, তিনি জীবিত আছেন এবং তাকে পাহাড় থেকে নামিয়ে আনা হচ্ছে। প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।”

দাওয়া শেরপার কিশোরী মেয়ে মেন্ডো লহামু শেরপা জানান, পরিবার তখন শেষকৃত্যের দ্বিতীয় দিনের ধর্মীয় আচার পালন করছিল।

তার ভাষায়, “প্রথমে খবর পেয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি যে, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তি সত্যিই আমার বাবা কি না। পরে আমরা তার ছবি পাঠাতে বলি। ছবি দেখে নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হই।”

কীভাবে নিখোঁজ হন?
গত ২৯ মে দাওয়া শেরপাকে সর্বশেষ এভারেস্ট থেকে নিচে নামতে দেখা যায়। তিনি একজন পোলিশ পর্বতারোহীর গাইড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার ক্লায়েন্ট নিরাপদে বেস ক্যাম্পে পৌঁছালেও দাওয়া আর ফিরে আসেননি।

এরপর তাকে খুঁজে বের করার জন্য অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়। তবে অনুসন্ধান দল গঠনে কিছুটা বিলম্ব হয় এবং পরে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হলেও তার কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

পর্বতের চরম প্রতিকূল আবহাওয়া, তুষারপাত, হিমশীতল তাপমাত্রা এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধার অভিযান অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে, তিনি আর জীবিত নেই।

অবিশ্বাস্য টিকে থাকার গল্প
ছয় দিন ধরে এভারেস্টের বিপজ্জনক অঞ্চলে নিখোঁজ থাকার পরও দাওয়া শেরপার বেঁচে থাকা পর্বতারোহণ মহলে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে। কীভাবে তিনি এতদিন প্রতিকূল পরিবেশে টিকে ছিলেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভারেস্ট অঞ্চলে দীর্ঘ সময় খাদ্য, পানি ও পর্যাপ্ত আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে খুম্বু আইসফল বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক পর্বতাঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখানে বরফধস, ফাটল এবং তুষারস্রোতের ঝুঁকি সবসময় থাকে।

ব্যস্ততম মৌসুমে দুর্ঘটনার শঙ্কা
এ বছর এভারেস্টে আরোহনের মৌসুম ছিল ইতিহাসের অন্যতম ব্যস্ততম। গত মাসে এক হাজারেরও বেশি পর্বতারোহী এবং তাদের গাইড বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গটি জয় করেছেন।

নেপাল সরকারের তথ্যানুযায়ী, চলতি মৌসুমে অন্তত পাঁচজন পর্বতারোহী বা গাইডের মৃত্যু হয়েছে। ফলে দাওয়া শেরপার জীবিত ফিরে আসার ঘটনাকে অনেকেই ‘অলৌকিক উদ্ধার’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

চিকিৎসকরা বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, তিনি অত্যন্ত দুর্বল ও পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন, তবে তার অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে।

দাওয়া শেরপার এই অবিশ্বাস্য ফিরে আসার ঘটনা এভারেস্টের কঠিন বাস্তবতার পাশাপাশি মানুষের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights