বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরছে বিশ্বের সবচেয়ে ‘ভারী পোকা
অনলাইন ডেস্ক
বিশ্বের সবচেয়ে ভারী পোকা হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডের এনডেমিক (নির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ) প্রজাতি ‘ওয়েটাপুঙ্গা’ বিলুপ্তির হাত থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পুনরুদ্ধারের পথে’ ফিরে এসেছে। একটি যুগান্তকারী কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচির মাধ্যমে প্রকৃতিতে প্রায় ১১ হাজার ওয়েটাপুঙ্গা অবমুক্ত করার পর এই অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে।
গত ২ অক্টোবর ‘নিউজিল্যান্ড জার্নাল অব জিওলজি’-তে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই প্রকল্পের সার্বিক সাফল্য তুলে ধরা হয়। নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণ বিষয়ক বিভাগের অনারারি গবেষক ও প্রতিবেদনটির সহ-লেখক ড. ক্রিস গ্রিন বলেন, ওয়েটাপুঙ্গার ভবিষ্যৎ এখন অত্যন্ত উজ্জ্বল। প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য ১১ হাজার পোকা প্রজনন করা সত্যি এক অসাধারণ ও অসামান্য অর্জন।
ওয়েটাপুঙ্গা প্রজাতির একটি পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী পোকার ওজন একটি সাধারণ ইঁদুরের সমান হতে পারে। এদের দেহের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটার (প্রায় ৪ ইঞ্চি) পর্যন্ত হয় এবং পা ছড়িয়ে দিলে এর ব্যাপ্তি দাঁড়ায় প্রায় ২০ সেন্টিমিটার। নিউজিল্যান্ডের ৭০টি ‘ওয়েটা’ প্রজাতির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়।
একসময় নিউজিল্যান্ডের উত্তর দ্বীপে (নর্থ আইল্যান্ড) প্রচুর ওয়েটাপুঙ্গা দেখা যেত। তবে বাইরে থেকে আনা শিকারী প্রাণী এবং বাসস্থান ধ্বংসের কারণে এদের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমতে থাকে। ১৯৯০-এর দশকের মধ্যে প্রজাতিটি ‘বিপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে নিউজিল্যান্ডের মূল ভূখণ্ড থেকে এটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে ধরে নেওয়া হয়। মূলত অকল্যান্ডের হাউরাকি উপসাগর এবং নর্থল্যান্ড উপকূলের শিকারীমুক্ত কয়েকটি দ্বীপে অল্প কিছু পোকা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছিল।
তবে গত ১৫ বছরে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। অকল্যান্ডের ‘বাটারফ্লাই ক্রিক’ বন্যপ্রাণী কেন্দ্র এবং অকল্যান্ড চিড়িয়াখানায় প্রজনন কৌশলের মাধ্যমে হাজার হাজার ওয়েটাপুঙ্গার জন্ম দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে অকল্যান্ডের উত্তরের বিভিন্ন শিকারীমুক্ত দ্বীপ ও মূল ভূখণ্ডের সংরক্ষিত বনে সেগুলোকে অবমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বাটারফ্লাই ক্রিক ও অকল্যান্ড চিড়িয়াখানা যৌথভাবে বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্র তৈরি করে বিপুল সংখ্যক ওয়েটাপুঙ্গা লালন-পালন নিশ্চিত করে। বাচ্চা পোকা বা নিম্ফগুলোকে মূলত তাজা পাতা, মাছের ফ্লেক প্রোটিন এবং ঝরা পাতার মিশ্র খাদ্য দেওয়া হয়। ড. গ্রিন জানান, একদম ছোট ছানাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই প্রোটিনযুক্ত খাবার অত্যন্ত সংকটপূর্ণ ও আবশ্যকীয় ছিল।
পোকাগুলো যখন নিজেদের রক্ষা করার মতো যথেষ্ট বড় হয়ে ওঠে, তখন সেগুলোকে নতুন প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়। এ পর্যন্ত মোট ৪৫টি ধাপে এদের বন্য পরিবেশে স্থানান্তর করা হয়েছে, যা যেকোনো প্রাণী পুনরুত্থান কর্মসূচির জন্য একটি রেকর্ড।
দ্বীপে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে দেখা গেছে, অন্তত দুটি দ্বীপে ওয়েটাপুঙ্গারা স্বাবলম্বী হয়ে প্রজনন শুরু করেছে এবং সেখানে ইতিমধ্যেই এদের চতুর্থ ও পঞ্চম প্রজন্মের জন্ম হয়েছে। এই সাফল্যের ওপর ভিত্তি করে প্রজাতিটির সংরক্ষণের স্থিতি ‘জাতীয়ভাবে বিপন্ন’ থেকে উন্নীত করে ‘জাতীয়ভাবে পুনরুদ্ধারের পথে’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডে কেবল নির্দিষ্ট অঞ্চলেই পাওয়া যায় এমন প্রজাতি বেশি হলেও বহিরাগত ক্ষতিকর প্রাণীর কারণে এখানকার অনেক প্রাণীই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। ড. গ্রিন জানান, অমেরুদণ্ডী প্রাণী সুরক্ষায় নিউজিল্যান্ড বিশ্বে নেতৃত্বের স্থানে রয়েছে এবং এত বড় পরিসরে সফলভাবে প্রজনন কর্মসূচি চালানোর অন্য কোনো উদাহরণ তার জানা নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই প্রকল্পের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বিপন্ন প্রাণী রক্ষায় এগিয়ে আসবে।
