. বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে নজিরবিহীন সাইবার চুরি

বিশেষ প্রতিনিধি: বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে ভয়াবহ সাইবার হামলার ঘটনায় ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়াভিত্তিক কুখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ করছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। ইতোমধ্যে চুরি হওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক জব্দ করা গেলেও বাকি সম্পদ উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রেখেছে বাইন্যান্স।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর বাইন্যান্সের বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেটে সাইবার হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ হাতিয়ে নেয় হ্যাকাররা। ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, ১০টি ব্লকচেইন থেকে মোট প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চুরি হওয়া সম্পদের বড় অংশই মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়।

ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে বাইন্যান্সের ধারণা ছিল, প্রতিষ্ঠানটির একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার মধ্য দিয়ে এই সাইবার হামলার সূচনা হয়। ওই কম্পিউটারে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ কাজে লাগিয়ে হ্যাকাররা লেনদেন পরিচালনার প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় প্রবেশ করে। তবে পরবর্তী তদন্তে একাধিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় দুর্বলতা ও অনুপ্রবেশের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, হামলাটি প্রাথমিকভাবে ধারণা করা ঘটনার চেয়ে অনেক বেশি পরিকল্পিত ও জটিল ছিল।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের বিশ্লেষণে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটার’-এর সংশ্লিষ্টতার জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গোষ্ঠীটি ‘লাজারাস গ্রুপ’ নামেও পরিচিত। এর আগে ২০২৫ সালে ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইবিট থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনায়ও উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের দায়ী করা হয়েছিল।

হামলার পরপরই চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান, ব্লকচেইন বিশ্লেষক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের চুরি হওয়া সম্পদ জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণে নিজস্ব তহবিল ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সিক্রেট সার্ভিসও তদন্ত ও উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, চুরি হওয়া ডিজিটাল সম্পদের অবস্থান শনাক্ত, সেগুলো জব্দ এবং উদ্ধারে সার্বক্ষণিক কাজ চলছে। একই সঙ্গে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কাজে টেথার ও সার্কেলের মতো শীর্ষস্থানীয় স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতা করছে। সন্দেহভাজন ডিজিটাল ওয়ালেটে থাকা সম্পদ জব্দ করার ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রেখেছে।

বাইন্যান্সে এই বড় ধরনের সাইবার হামলার প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েনের বাজারমূল্য ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। একই সময়ে ইথেরিয়াম ও সোলানাসহ অন্যান্য জনপ্রিয় ডিজিটাল মুদ্রার দামেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দেয়। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

২০১৭ সালে যাত্রা শুরু করা বাইন্যান্সের বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটির বেশি নিবন্ধিত ব্যবহারকারী রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই এক্সচেঞ্জে এমন বড় ধরনের সাইবার হামলা ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল সম্পদ সুরক্ষায় শুধু ওয়ালেটের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং লেনদেন অনুমোদন, পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত পুরো প্রযুক্তিগত অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights