বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে

অনলাইন ডেস্ক

দেশের বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের গতি থমকে গেছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় নতুন প্রকল্প হাতে নিতে সাহস পাচ্ছেন না উদ্যোক্তারা।

অনেক ব্যবসায়ী এখন নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানোর বদলে পুরনো ঋণ ও দায় সামলাতেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে ব্যাংকঋণের চাহিদা কমে গেছে। ব্যাংকগুলোতে বিপুল পরিমাণ অর্থ অলস পড়ে থাকলেও নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.১৭ শতাংশে নেমেছে।

আগের মাস আগস্টে এই হার ছিল ৪.৭৫ শতাংশ। এর আগে জুনে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪.৪৭ শতাংশ এবং জুলাইয়ে ৪.৬২ শতাংশ। মার্চ ও এপ্রিলে এই হার ছিল ৪.৭২ শতাংশ। মে মাসে সামান্য বেড়ে ৪.৯৮ শতাংশ হলেও এরপর আবার কমতে থাকে।

সব মিলিয়ে টানা সাত মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমান প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক নিচে থাকায় নির্ধারিত সময়ে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে ব্যাংকের তারল্যসংকট প্রধান কারণ নয়। বরং নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিছু ব্যাংক আর্থিক চাপে থাকলেও সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে তারল্যের ঘাটতি নেই।

অনেক ব্যাংকের হাতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থ রয়েছে। গত আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। একটি বেসরকারি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বাজারে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না। ছোট ব্যবসা থেকে বড় হওয়ার মতো নতুন গ্রাহকও খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোকে পুরনো ও প্রতিষ্ঠিত করপোরেট গ্রাহকদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নতুন ব্যবসা ও বিনিয়োগের উদ্যোগ না থাকায় ঋণের আবেদনও কমে গেছে।

ব্যাংকারদের মতে, ঋণ প্রবৃদ্ধির যে হিসাব প্রকাশ করা হচ্ছে, তার পুরোটাই নতুন ঋণ বিতরণের প্রতিফলন নয়। আগে দেওয়া ঋণের বিপরীতে অনাদায়ি সুদ মূল ঋণের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং পুরনো দায় মেটাতে নতুন ঋণ সৃষ্টি হওয়ার মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখে। এসব বিষয় বাদ দিলে প্রকৃত নতুন ঋণপ্রবাহ আরো কম হতে পারে।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) ১১তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে বেসরকারি বিনিয়োগের এই স্থবিরতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে সুশাসন ফেরানোর উদ্যোগ শুরু হলেও বেসরকারি বিনিয়োগে এখনো গতি ফেরেনি। নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবসায়ীদের ঋণ নেওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।

এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প-কারখানা চালুর জন্য। তবে এই তহবিল থেকেও ঋণ বিতরণে প্রত্যাশিত গতি নেই। গত ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ কারখানা চালুর জন্য নির্ধারিত তহবিল থেকে বিতরণ করা হয়েছে মাত্র ৫৬১ কোটি টাকা। আর পুরো প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ছাড় হয়েছে প্রায় ১১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights