ভারতের এআই উত্থানে বদলে যাচ্ছে কেরালার নারীদের জীবন
অনলাইন ডেস্ক
ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর সুফল পাচ্ছেন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার নারীরাও। বিশেষ করে ডেটা অ্যানোটেশনের মতো কাজ শিক্ষিত নারীদের প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের নতুন পথ তৈরি করেছে।
কেরালার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোকসে ডেটা অ্যানোটেটর হিসেবে কাজ করছেন রোশনি এম। তার কাছে এই চাকরির গুরুত্ব শুধু মাসিক বেতনে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তাকে দিয়েছে আর্থিক স্বনির্ভরতা ও নিজের জীবনের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।
বাবার মৃত্যুর পর পরিবারের পাশে দাঁড়াতে কাজ শুরু করেন রোশনি। বর্তমানে তিনি কেরালাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোকসের শত শত কর্মীর একজন। প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সেগুলো শ্রেণিবদ্ধ করার কাজ করে।
রোশনি বলেন, “আমি এখন নিজেকে একজন স্বতন্ত্র মানুষ মনে করি। আমি আয় করছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছি এবং স্বাধীনতা পেয়েছি। আর্থিক স্বাধীনতা সত্যিই আলাদা এক অনুভূতি।”
এআই প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা অ্যানোটেশন
এআই প্রযুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে ডেটা অ্যানোটেশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মেশিনকে বাস্তব জগতের বিভিন্ন বস্তু ও পরিস্থিতি চিনতে শেখানোর জন্য বিপুল পরিমাণ তথ্যকে সঠিকভাবে চিহ্নিত ও শ্রেণিবদ্ধ করতে হয়। যেমন: স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে সক্ষম গাড়িকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সময় রাস্তা, গাড়ি, পথচারী, ট্রাফিক সংকেতসহ বিভিন্ন বস্তুকে শনাক্ত করে ডেটায় আলাদা করে চিহ্নিত করতে হয়।
ডেটা অ্যানোটেটররা ছবি ও অন্যান্য তথ্যের ওপর এসব বস্তু চিহ্নিত করে দেন। পরে সেই তথ্য ব্যবহার করে এআই সিস্টেমকে বিভিন্ন বিষয় শনাক্ত করতে শেখানো হয়।
এআই প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই এ ধরনের কাজের চাহিদাও তৈরি হচ্ছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতে সরাসরি সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং বা প্রকৌশলভিত্তিক দক্ষতা না থাকা মানুষের জন্যও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কেরালায় প্রযুক্তি খাতের বিস্তার
২০১৬ সালে মুজিব কোলাসেরি প্রতিষ্ঠা করেন ইনফোকস। প্রতিষ্ঠানটি কেরালার ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি খাতের একটি অংশ, যেখানে ভারতের প্রচলিত বড় প্রযুক্তি শহরগুলোর বাইরে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ভারতের প্রযুক্তি শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও পুনের মতো শহরকেন্দ্রিক ছিল। তবে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা ও সেবার বিস্তারের ফলে কেরালার মতো রাজ্যেও ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বাড়ছে।
এর মধ্যে ডেটা অ্যানোটেশনের মতো কাজ নারীদের জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত নারীরা, যারা নানা সামাজিক বা পারিবারিক কারণে আগে প্রযুক্তি খাতে প্রবেশের সুযোগ পেতেন না, তাদের জন্য এ ধরনের চাকরি নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে।
বদলাচ্ছে নারীদের কাজের সুযোগ
রোশনি মনে করেন, আগের প্রজন্মের নারীদের তুলনায় বর্তমান সময়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ অনেক বেড়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের মা কিংবা পরিবার ও পরিচিতদের অন্য নারীদের জীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু পড়াশোনা করা বা চাকরি করার জন্যও তাদের অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু এখন অবকাঠামো অনেক বদলেছে, মানুষের মানসিকতাও পরিবর্তিত হয়েছে।”
তবে এই পরিবর্তনের পরও গ্রামীণ এলাকার নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ ও কর্মপরিবেশে নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। অনেক নারী বেতন বা কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন। কারণ, চাকরি হারানোর ভয় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব তাদের অনেক সময় নীরব থাকতে বাধ্য করে।
আর্থিক স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরাপত্তাও
রোশনি অবশ্য তার কর্মজীবনের অভিজ্ঞতাকে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক বলে মনে করেন। তিনি জানান, ভালো বেতনের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিমার মতো সুবিধাও তার কর্মজীবনকে আরও নিরাপদ করেছে।
তার কাছে এই চাকরির সবচেয়ে বড় অর্জন হলো নিজের উপার্জনের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ।
রোশনি বলেন, “আমরা নিজের জন্য আয় করতে পারি, একই সঙ্গে আমাদের পরিবারের জন্যও আরও ভালো জীবন নিশ্চিত করতে পারি।”
এআই শিল্পের দ্রুত বিকাশ তাই শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তনই আনছে না; ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলে দিচ্ছে। কেরালার নারীদের জন্য ডেটা অ্যানোটেশনের মতো নতুন কাজ সেই পরিবর্তনেরই একটি উদাহরণ। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রযুক্তি-হাবের বাইরে থাকা নারীদের জন্য এসব কর্মসংস্থান ভবিষ্যতে আরও বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। সূত্র: ডয়েচে ভেলে, টাইমস অব ওমান
