মহারণের আগে যে তথ্যে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন

অনলাইন ডেস্ক

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই পরাশক্তি যখন বিশ্বসেরার মুকুটের লড়াইয়ে নামে, তখন মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে আলোচনা ছড়ায় নানা পরিসংখ্যান আর অলৌকিক বিশ্বাসের। আজ রবিবার নিউজার্সিতে বিশ্বকাপের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। যেখানে একদিকে রয়েছে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার হাতছানি, অন্যদিকে ইউরোর পর বিশ্বকাপ জিতে ফুটবল বিশ্বে নিজেদের একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই।

খেলা পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন স্লোভেনিয়ার স্লাভকো ভিনচিচ, যিনি ইতিহাসের প্রথম স্লোভেনীয় হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিচালনা করছেন। ভিনচিচের ম্যাচ পরিচালনার ইতিহাস দুই দলের জন্যই বেশ মিশ্র অনুভূতির। ২০২৪ সালের ইউরো সেমিফাইনালে স্পেনের ফ্রান্স জয়ের ম্যাচটি তিনিই চালিয়েছিলেন, আবার ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার সেই ঐতিহাসিক হারের ম্যাচটির রেফারিও ছিলেন তিনি। এই টুর্নামেন্টে বেশ কড়া মেজাজে থাকা ভিনচিচ গড়ে প্রতি ম্যাচে ২.৩৩টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন, যার মধ্যে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে মুখে হাত দিয়ে কথা বলায় একুয়াদরের পিয়েরো হিনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখানোর ঘটনাও রয়েছে।

পরিসংখ্যান ও বিশ্রামের দিকে তাকালে ম্যাচটিতে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে স্পেন। গত ১৪টি বিশ্বকাপ ও ইউরো ফাইনালের (পুরুষ ও নারী উভয় ক্ষেত্রে) মধ্যে ১৩ বারই শিরোপা জিতেছে সেই দল, যারা সেমিফাইনাল ম্যাচটি আগে খেলেছিল। এবার স্প্যানিশরা আর্জেন্টিনার চেয়ে একদিন বেশি বিশ্রামের সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া টুর্নামেন্টে মাঠের লড়াইয়ের হিসেবেও স্প্যানিশরা কিছুটা সতেজ থাকবে। নকআউট পর্বের সব ম্যাচই তারা নির্ধারিত ৯০ মিনিটে শেষ করেছে, যেখানে আর্জেন্টিনাকে দুবার অতিরিক্ত সময়ে খেলতে হয়েছে। সব মিলিয়ে ৭৯৪ মিনিট মাঠে দৌড়াতে হয়েছে লিওনেল মেসিদের, আর লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা খেলেছেন ৭১৭ মিনিট। অবশ্য কাতার বিশ্বকাপেও অতিরিক্ত সময় খেলেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্জেন্টিনা, তবে চার বছরের বুড়িয়ে যাওয়া দলটির জন্য এবার সেই ধকল সামলানো বড় পরীক্ষা হবে।

আর্জেন্টাইন শিবিরের জন্য বড় এক স্বস্তির নাম তাদের ‘অশুভ লক্ষণ’ বা কুসংস্কার এড়ানোর প্রাচীন প্রথা। টানা ৩৬ বছর ধরে আর্জেন্টিনার কোনো প্রেসিডেন্ট মাঠে গিয়ে জাতীয় দলের বিশ্বকাপ ম্যাচ দেখেন না। ১৯৯০ বিশ্বকাপে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট কার্লোস মেনেম মাঠে হাজির হওয়ার পরই ক্যামেরুনের কাছে হেরে বসেছিল আর্জেন্টিনা। সেই থেকে বিশ্বাস করা হয়, প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি দলের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই-ও সেই ধারা বজায় রেখে বুয়েনস আইরেসের বাসভবন থেকেই খেলা দেখছেন এবং নিউ জার্সিতে না যাওয়ার কথা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। বিপরীতে, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ গ্যালারিতে থেকে স্প্যানিশদের সমর্থন জোগাবেন।

ফুটবলীয় কৌশলের বিচারে এই ফাইনালটিকে গোলবন্যা বনাম দুর্ভেদ্য রক্ষণভাগের লড়াই বলা চলে। পুরো টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনা সর্বোচ্চ ১৯টি গোল করে আক্রমণে আধিপত্য দেখিয়েছে। অপরদিকে রক্ষণভাগে ইস্পাতকঠিন দেয়াল তুলে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে স্পেন। মাঠের এই রণকৌশল সাজাচ্ছেন এমন দুই কোচ, যাদের কাউরই ক্লাব ফুটবলের শীর্ষ স্তরে কোচিং করানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তের ক্লাব ক্যারিয়ার বলতে আল আভেসের হয়ে মাত্র ১১ ম্যাচের অভিজ্ঞতা, আর আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি তো অনূর্ধ্ব-২০ দল ছাড়া সরাসরি জাতীয় দলের দায়িত্বই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তবে দুজনের শোকেসেই ইতিমধ্যে ইউরো, কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপের ট্রফি যুক্ত হওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সফল হতে ক্লাব ফুটবলের প্রোফাইল জরুরি নয়।

চলতি বছর কাতারেই এই দুই দলের মুখোমুখি হওয়ার কথা ছিল ‘ফিনালিসিমা’ ম্যাচে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ম্যাচটি বাতিল হয়ে যায়। ফলে সেই অপ্রাপ্তির পর এটিই তাদের প্রথম দ্বৈরথ। এর আগে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে মাত্র একবারই দল দুটি মুখোমুখি হয়েছিল, যেখানে লুইস আরতিমের জোড়া গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।

আমেরিকান সংস্কৃতির ছোঁয়া লেগে এবারের ফাইনালের বিজয়ীদের জন্য রাখা হয়েছে বিশেষ চ্যাম্পিয়নশিপ রিং। ফিফার ওয়েবসাইট অনুযায়ী, মূল ট্রফির পাশাপাশি ৩০টি রিং দেওয়া হবে চ্যাম্পিয়নদের, যার একপাশে থাকবে বিশ্বকাপের অবয়ব এবং অন্যপাশে থাকবে বিজয়ী দেশের নিজস্ব পরিচিতি। নিউ জার্সির মাঠের আবহাওয়া নিয়েও কিছুটা উদ্বেগ ছিল, কানাডার দাবানলের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণের কারণে জারি হয়েছিল সতর্কতা। তবে ফাইনালের আগে পরিস্থিতি অনেকটাই উন্নত হয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একটি ম্যাচ খোলা স্টেডিয়ামে খেলা স্পেনের জন্য এই পরিবেশ নতুন হলেও আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যে তিনবার এমন খোলা ও ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রতিকূল আবহাওয়ায় খেলে অভ্যস্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights