মার্কিন রাজনীতি কি নাৎসির পথে?
অনলাইন ডেস্ক
মার্কিন রাজনীতিকে নাৎসি যুগের সাথে তুলনা করার সঠিক সময় কখন? ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের অন্যতম শীর্ষ বিশেষজ্ঞ রবার্ট পি জোন্স মনে করেন, সেই সময়টি হলো এখনই। তার সাম্প্রতিক বই ‘ব্যাকস্লাইড: রিক্লেইমিং এ ফেইথ অ্যান্ড এ নেশন আফটার দ্য ক্রিশ্চিয়ান টার্ন এগেইনস্ট ডেমোক্রেসি’তে জোন্স তুলে ধরেছেন কীভাবে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের হ্রাসপ্রাপ্ত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক আঁতাত তৈরি করেছে। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে নাৎসি দলের উত্থান এবং সাধারণ জার্মান খ্রিস্টানদের নীরব সহযোগিতার ইতিহাস দিয়ে শুরু হওয়া এই বইটিতে সতর্ক করা হয়েছে যে, বর্তমান মার্কিন গণতন্ত্র একটি গুরুতর ও উদ্বেগজনক পতনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
জোন্সের মতে, মার্কিন সমাজে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদের জনমিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ২০০৮ সালে বারাক ওবামার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময়ও মার্কিন জনসংখ্যার ৫৪ শতাংশ ছিল শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান, যা ২০১৪ সালে কমে ৪৭ শতাংশে দাঁড়ায় এবং বর্তমানে তা মাত্র ৪১ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া রক্ষণশীল রাজনীতির মূল ভিত্তি হিসেবে পরিচিত শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিকাল বা সুসমাচার প্রচারকদের সংখ্যা শতাব্দীর শুরুর এক চতুর্থাংশ থেকে কমে বর্তমানে মাত্র ১৩ শতাংশে ঠেকেছে।
সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণের মুখে পড়ে এই গোষ্ঠীটি আধিপত্য হারানোর অস্তিত্বগত সংকটে ভোগে, যা ট্রাম্পের উগ্র জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির জন্য উর্বর ভূমি তৈরি করেছে। ট্রাম্পের অভিবাসী বিরোধী বক্তব্য, তাদের ‘কীটপতঙ্গ’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া এবং দেশের রক্তকে ‘দূষিত’ করার মতো বর্ণবাদী ভাষা নাৎসি আমলের বর্ণশুদ্ধির তত্ত্বকেই মনে করিয়ে দেয় বলে জোরালোভাবে মন্তব্য করেছেন জোন্স।
ওয়াশিংটনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গবেষক রবার্ট পি জোন্স জানান, ট্রাম্পের সাথে এই খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর চুক্তিটি পুরোপুরি ক্ষমতার লেনদেনভিত্তিক। ট্রাম্প তাদের ভোট ও ক্ষমতার পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিনিময়ে সুসমাচার প্রচারকরা তার বহু ত্রুটি এবং অনৈতিক আচরণ উপেক্ষা করতে দ্বিধাবোধ করেননি।
এমনকি প্রচারণায় ট্রাম্প নিজেই বলেছিলেন যে, এবার ভোট দিলে ভবিষ্যতে তাদের আর ভোট দিতে হবে না, তিনি বিষয়টি ঠিক করে দেবেন। অথচ নব্বইয়ের দশকে জেরালড ফ্যালওয়ে বা জর্জ ডব্লিউ বুশের আমলের ‘মোরাল মেজরিটি’ বা নৈতিক মূল্যবোধের রাজনীতির লেবাস এখন আর এই আন্দোলনে নেই; এর পরিবর্তে এটি প্রকাশ্যেই একটি অগণতান্ত্রিক খ্রিস্টীয় জাতীয়তাবাদের রূপ নিয়েছে।
পাবলিক রিলিজিয়ন রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআরআই)-এর দীর্ঘ পরিসরভিত্তিক তথ্য তুলে ধরে জোন্স বলেন, শ্বেতাঙ্গ ইভানজেলিকালদের ক্ষেত্রে গির্জায় নিয়মিত যাওয়া মানুষকে আরও বেশি উদার বা গণতান্ত্রিক করে তোলে না, বরং খ্রিস্টীয় জাতীয়তাবাদ, অভিবাসী বিরোধী, কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলিম বিরোধী উগ্র দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলায় খ্রিস্টীয় প্রতীক ও যিশুর নামের ব্যানার ব্যবহারের ঘটনাটি রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকরা সেভাবে গুরুত্ব না দিলেও এটি এই আন্দোলনেরই একটি বিপজ্জনক প্রকাশ ছিল। বর্তমানে প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ থেকে শুরু করে প্রজেক্ট ২০২৫-এর মূল পরিকল্পনাকারী রাসেল ভটের মতো কট্টরপন্থীরা সরকারি কাঠামোর ভেতর এই আদর্শকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
তবে জোন্স পুরোপুরি নিরাশাবাদী নন। তিনি মনে করেন, এই গণতান্ত্রিক পতন বা পিছিয়ে পড়া প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নয়। আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক বিকল্প খ্রিস্টান কণ্ঠস্বর ও রাজনৈতিক নেতারা গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে শুরু করেছেন। জার্মানির প্রতিবাদী ল্যুথারান যাজক মার্টিন নিমোলারের ঐতিহাসিক উদাহরণের কথা স্মরণ করে জোন্স আহ্বান জানিয়েছেন যে, শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টানদেরই বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে নিজেদের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক হওয়া থেকে রক্ষা করতে হবে এবং কর্তৃত্ববাদী ও উগ্র রাজনীতির বিরুদ্ধে এখনই সোচ্চার হতে হবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
