মোজতবা খামেনি সম্পর্কে যে চমকপ্রদ তথ্য দিলেন স্বজনরা

অনলাইন ডেস্ক

ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা বা আয়াতুল্লাহ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত জনসম্মুখে আসেননি মোজতবা খামেনি। তার নতুন কোনো ছবি বা সাক্ষাৎকার প্রকাশ না পেলেও তার প্রয়াত স্ত্রীর পরিবার সম্প্রতি দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে তাকে একজন প্রগতিশীল ও আধুনিক সাংস্কৃতিক মনস্ক ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। শ্বশুরবাড়ির স্বজনদের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি শুধু স্টার্টআপ বা প্রযুক্তির প্রতি অনুরাগীই নন বরং বিখ্যাত ব্রিটিশ চলচ্চিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের কাজের সঙ্গেও বেশ পরিচিত এবং নিয়মিত সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন।

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির বড় ছেলে ৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি গত ৮ মার্চ বিশেষজ্ঞ পরিষদ (অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস) কর্তৃক দেশটির নতুন আয়াতুল্লাহ হিসেবে নিযুক্ত হন। এর ঠিক নয় দিন আগে, ২৮ ফেব্রুয়ারি খামেনির প্রাঙ্গণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এক যৌথ বিমান হামলায় তার বাবা আলী খামেনি এবং স্ত্রী জোহরা হাদ্দাদ-আদেল নিহত হন। ওই হামলায় অলৌকিকভাবে বেঁচে যান মোজতবা। ১৯৯৯ সালে তিনি জোহরাকে বিয়ে করেছিলেন।

সম্প্রতি ইরান সরকারের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলোতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোজতবা খামেনির ব্যক্তিগত পছন্দ ও জীবনযাত্রার কথা তুলে ধরেছেন তার নিহত স্ত্রীর ভাই ফরিদেদ্দিন হাদ্দাদ আদেল। তিনি জানান, তার ভগ্নিপতি প্রযুক্তির উন্নয়ন, নতুন স্টার্টআপ, মনস্তত্ত্ব, প্রজ্ঞানাত্মক বিজ্ঞান (কগনিটিভ সায়েন্স) এবং চলচ্চিত্রের প্রতি ব্যাপক আগ্রহী। ফরিদেদ্দিনের কথায়, তার বাবার মতো সাহিত্য অনুরাগী না হলেও মোজতবা প্রচুর চলচ্চিত্র দেখেন এবং ক্রিস্টোফার নোলানের পরিচালনার স্টাইলের সঙ্গে বেশ পরিচিত।

ইংরেজি ভাষা শেখার প্রতি মোজতবার অধ্যবসায়ের কথা প্রকাশ করেছেন তার শাশুড়ি তাইয়েবে মাহরুযাদেহ। গত জুনে পুন প্রকাশিত এক বক্তব্যে তিনি জানান, ১৯৯৯ সালে তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার আগেই মোজতবা খামেনি ইংরেজি ভাষার দক্ষতা প্রমাণের আন্তর্জাতিক সনদ ‘টোফেল’ অর্জন করেছিলেন এবং বিদেশি ভাষা শিখতে তিনি বেশ পরিশ্রমী।

রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে মোজতবার দীর্ঘ উপস্থিতি স্পষ্ট করে ফরিদেদ্দিন জানান, তিনি গত প্রায় ২৫ বছর ধরে তার বাবার সাথে নিরাপত্তা, সামরিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। ১৯৯৭ সালের মে মাসে সংস্কারপন্থী প্রার্থী মোহাম্মদ খাতামি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হয়। সে সময় সংস্কারপন্থীদের আইনি ও রাজনৈতিক নানা পদক্ষেপে বাধা সৃষ্টি করতে আলি খামেনি ও তার অনুগত প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন মোজতবা। পরবর্তীতে সাবেক প্রেসিডেন্ট খাতামি খেদ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তার শাসনকালে প্রতি নয় দিনে একটি করে সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

তবে আধুনিক সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি মোজতবাকে সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। তিনি অতি সাদামাটা পোশাক পরেন, কম ঘুমান এবং অত্যন্ত সংযমী জীবন কাটান বলে দাবি করেছে তার প্রয়াত স্ত্রীর পরিবার। অবশ্য এই ব্যক্তিগত বিবরণগুলোর সত্যতা স্বাধীন কোনো উৎস থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থায় শীর্ষ নেতাদের সাধাসিধা ও অনড় জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরা একটি পুরানো কৌশল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শের প্রতি অনুগত রাখা এবং দুর্নীতির অভিযোগ থেকে নেতাদের আড়াল করতে অতীতে আলী খামেনির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রচার চালানো হতো। বর্তমানে মোজতবা খামেনির ক্ষেত্রেও একই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে; যেখানে একদিকে তাকে শিয়া ধর্মীয় এবং কট্টর নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত হিসেবে দেখানো হচ্ছে, আবার অন্যদিকে পশ্চিমা সিনেমা, ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক প্রযুক্তির খবর রাখা একজন আধুনিক মনের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চলছে, যাতে তিনি বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে না গিয়েও নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন।

মোজতবার শ্বশুর গোলাম-আলী হাদ্দাদ-আদেল ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ও কট্টর রক্ষণশীল নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি পূর্বে দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার এবং আলী খামেনির প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

সূত্র: ইউরো নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights