যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত: সিমাই সারাফ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান ও পশ্চিমাপক্ষীয় জোটের মধ্যকার যুদ্ধ এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন মোড় নিয়েছে। গত কয়েক দিনে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন প্রদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণাকেন্দ্র এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়েছে একের পর এক বিধ্বংসী বিমান হামলা।

উত্তর তেহরানের অন্যতম অভিজাত বিদ্যাপীঠ শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেজার অ্যান্ড প্লাজমা রিসার্চ ইনস্টিটিউট মার্কিন ও ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের গোলার আঘাতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। যুদ্ধের শুরুতে অধিকাংশ ক্লাস অনলাইনে স্থানান্তরিত হওয়ায় কোনো শিক্ষার্থীর প্রাণহানি না ঘটলেও, এই হামলাকে ইরানের বৈজ্ঞানিক অগ্রযাত্রার ওপর এক অপূরণীয় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী হোসেন সিমাই সারাফ এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটির অন্তত ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ ও গবেষণাকেন্দ্র সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর অর্থ হলো একটি আধুনিক সভ্যতাকে ‘প্রস্তর যুগে’ ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইরানের জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাক্ষেত্রেও নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়। শতবর্ষী প্রাচীন এবং স্বনামধন্য পাস্তুর ইনস্টিটিউট, যা টিকা উৎপাদন ও সংক্রামক ব্যাধি গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, সেটিও বোমাবর্ষণে অচল হয়ে পড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস জানিয়েছেন, গত মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত ২০টি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলা হয়েছে। এর মধ্যে তেহরানের দোলোরাম সিনা মানসিক হাসপাতাল এবং তৌফিক দারু নামক একটি বৃহৎ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। তৌফিক দারু ইরানের ক্যানসার ও অ্যানেস্থেসিয়া ওষুধের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী ছিল, যার ধ্বংসের ফলে দেশজুড়ে জরুরি ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইসরায়েলি পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কাজে লিপ্ত ছিল, যদিও ইরান সরকার এই দাবিকে ‘হাস্যকর ও মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইরানের অবকাঠামো ধ্বংসের এই অভিযানে গত শুক্রবার আলবোরজ প্রদেশের কারাজ এলাকায় অবস্থিত নবনির্মিত বি-ওয়ান সেতুতে চালানো হামলাটি ছিল সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। ১৩৬ মিটার উঁচু এই ঝুলন্ত সেতুটি যখন মার্কিন যুদ্ধবিমানের গোলার আঘাতে ধসে পড়ে, তখন তার নিচে বহু ইরানি পরিবার ঐতিহ্যবাহী ‘সিজদাহ বে-দার’ বা প্রকৃতি দিবস উদযাপনে ব্যস্ত ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রথম দফার হামলার পর যখন উদ্ধারকর্মীরা সেখানে পৌঁছান, তখন দ্বিতীয়বার ‘ডাবল ট্যাপ’ হামলা চালানো হয়। এই হামলায় অন্তত ৮ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ৯৫ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সেতুটি গোপনে সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে ব্যবহৃত হচ্ছিল। তবে এই হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ধ্বংসপ্রাপ্ত সেতুর ভিডিও শেয়ার করে ইরানের প্রতি এক কঠোর আলটিমেটাম জারি করেছেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য ইরানের হাতে আর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা সময় অবশিষ্ট রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে কোনো সমঝোতায় না পৌঁছালে ইরানের প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং পানিশোধন কেন্দ্রগুলোতে একযোগে হামলা চালিয়ে সেগুলোকে চিরতরে অকেজো করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন তিনি।

ইতোমধ্যেই মাহশাহার অঞ্চলের তেল শোধনাগার এবং বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংলগ্ন স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়ে ইরানকে চাপের মুখে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, তাদের অব্যাহত হামলায় ইরানের ইস্পাত উৎপাদন ক্ষমতার ৭০ শতাংশই এখন বিলুপ্ত। পাল্টা জবাবে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা যেকোনো মূল্যে দেশ রক্ষা করবে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে, বেসামরিক স্থাপনা ও জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights