যুক্তরাষ্ট্র হামলা থামানোর পর কেন আবার যুদ্ধ শুরু করল ইরান?
অনলাইন ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে কয়েক দিনের আপাত শান্তির অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাষায় একটি ‘অপ্রত্যাশিত’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এবার তেহরান কোনও নতুন মার্কিন হামলার জবাব হিসেবে নয়, বরং নিজ উদ্যোগেই আবার সামরিক অভিযান শুরু করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণে তারা আর শুধু প্রতিক্রিয়াশীল অবস্থানে থাকতে চায় না; বরং নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজন হলে আগেভাগেই সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
তেহরানের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
ট্রাম্পের হুমকি, পাল্টা মার্কিন হামলা
ইরানের হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান।
ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা তাদের কঠোরভাবে আঘাত করব। তারা ভয়াবহ মূল্য দেবে।”
এর কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের হামলার চেষ্টার জবাবে তারা ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দিয়েও কেন অবস্থান বদলাল তেহরান?
গত সপ্তাহে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ইরানই যুদ্ধবিরতির অনুরোধ করেছিল এবং আলোচনায় ফিরতে চেয়েছিল। তবে তেহরান কখনওই আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবি স্বীকার করেনি।
যদিও ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছিলেন, “আমাদের সশস্ত্র বাহিনীও সামরিক পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”
কিন্তু সেই অবস্থান থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়াকে বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
জার্মানির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের গবেষক হামিদ রেজা আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, ইরানের কৌশলে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে, তেহরান এখন মনে করছে যে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় যদি আগাম হামলা হয়, তবে সেই পথেও তারা হাঁটতে প্রস্তুত।
নেতানিয়াহুর ওয়াশিংটন সফরের পরই হামলা
ইরানের এই হামলার সময়টিও বিশ্লেষকদের দৃষ্টি কেড়েছে। হামলার কিছুক্ষণ আগেই ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৈঠক শেষে নেতানিয়াহু এটিকে দু’জনের মধ্যে হওয়া ‘সেরা আলোচনাগুলোর একটি’ বলে উল্লেখ করেন।
এর আগে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছিলেন, ইসরায়েল ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাতে চাইলেও ট্রাম্প প্রশাসন তা থেকে বিরত থাকতে বলেছিল।
হামিদ রেজা আজিজির মতে, জর্ডানে হামলাটি মূলত নেতানিয়াহুর হোয়াইট হাউস সফরের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ একটি রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা। এতে বোঝা যায়, সম্ভাব্য হুমকির আভাস পেলেই ইরান এখন আগাম হামলা চালাতে প্রস্তুত।
জর্ডানের পর ইরাকেও হামলা
জর্ডানে হামলার কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব যৌথভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের ওপর বিমান হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, এটি শুধু জর্ডানের ঘটনার প্রতিশোধ নয়; বরং গত ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন বাহিনী ও সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে, সংঘাত এখন শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ধীরে ধীরে পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
সৌদি আরবও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে
দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানো এড়িয়ে চলা সৌদি আরব এখন তিনটি ভিন্ন দিক থেকে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
• ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী
• ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী
• ইরান
ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, ওয়াশিংটন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো- ইরান কিংবা তার আঞ্চলিক মিত্রদের কেউই এখন তাদের কৌশলগত লক্ষ্য থেকে সরে আসতে রাজি নয়।
তার মতে, তেহরান হরমুজ প্রণালীর ওপর নিজের প্রভাব বজায় রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। অন্যদিকে হুথিরাও জানিয়েছে, সৌদি নেতৃত্বাধীন অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না।
হরমুজ প্রণালীই এখন ইরানের মূল কৌশল
জর্ডানে হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি তেহরানের অবস্থান স্পষ্ট করেন।
তিনি বলেন, ইরান আপাতত হামলা বন্ধ রেখেছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালীর ওপর দেশের সার্বভৌমত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা হলে তারা আবারও যুদ্ধ শুরু করতে দ্বিধা করবে না।
তার ভাষায়, যুদ্ধের আগে যে অবস্থায় হরমুজ প্রণালী ছিল, সেখানে ফিরে গেলে ইরান নিজেদের বিজয়ী মনে করবে না। কারণ, এই জলপথ এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষামূলক উপাদানে পরিণত হয়েছে।
বিকল্প নৌপথই ছিল ‘রেড লাইন’
গরিবাবাদি আরও বলেন, ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে একটি বিকল্প বাণিজ্যিক নৌপথ চালুর চেষ্টা করছিল। তেহরান এটিকে নিজেদের জন্য ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচনা করেছে।
তার মতে, যদি সেই বিকল্প পথ চালু হতো, তাহলে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দাবি বাস্তবে অর্থহীন হয়ে যেত।
তিনি বলেন, “বিষয়টি বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কেন ইরান তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আবার যুদ্ধ শুরু করল? কিন্তু পর্দার আড়ালের বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যেসব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ইরানের নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলবে।”
নতুন দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, তেহরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক হামলা বন্ধ রাখা দুর্বলতার লক্ষণ, সংযমের নয়। এই ধারণাই ইরানকে আরও আক্রমণাত্মক হতে উৎসাহিত করতে পারে।
ড্যানি সিট্রিনোভিচের মতে, এতে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যেখানে উভয় পক্ষই নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ভয় থেকে পিছু হটবে না। ফলে হামলা, পাল্টা হামলা এবং উত্তেজনার চক্র আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে- হয় ইরানের কিছু কৌশলগত দাবি আংশিকভাবে মেনে নেওয়া, নয়তো জ্বালানি অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথকে কেন্দ্র করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকা। সূত্র: সিএনএন
