যেভাবে ব্যস্ত সিনিয়র তারকারা

ষাট থেকে আশির দশকে বড় পর্দায় অভিনয়ে আসা শিল্পীরা মেধা ও দক্ষতা দিয়ে মন জয় করে নিয়েছিলেন দর্শকদের। পরিণত হয়েছিলেন তারকায়। এসব তারকার মধ্যে অনেকেই এ ধরাধামে এখন নেই। যাঁরা আছেন তাঁরা কেমন আছেন। সেই কথাই তুলে ধরেছেন-আলাউদ্দীন মাজিদ

ধর্মকর্ম নিয়ে ব্যস্ত শবনম

১৯৯৯ সালে শবনম সর্বশেষ অভিনয় করেন কাজী হায়াতের ‘আম্মাজান’ চলচ্চিত্রে। এ অভিনেত্রী জানান, বর্তমানে তিনি ধর্মকর্ম আর সংসারের কাজ নিয়ে অবসর সময় কাটাচ্ছেন রাজধানীর বারিধারার বাসায়। মনের মতো গল্প ও চরিত্র না পাওয়ায় তিনি আর অভিনয় ফিরতে পারছেন না বলেও জানান। পুরান ঢাকার নারিন্দার মেয়ে নন্দিতা বসাক ঝর্ণা। ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্রকার এহতেশাম কিশোরী শিল্পী হিসেবে তাঁকে ‘এ দেশ তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে ব্রেক দেন। এরপর আরও পাঁচটি চলচ্চিত্রে কিশোরী শিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। নায়িকা হিসেবে এহতেশাম পরিচালিত ‘চান্দা’ (১৯৬২) ঢালিউডে শবনমের স্থায়ী আসন গড়ে দেয়।

নামাজ-রোজায় দিন কাটে আনোয়ারার

২০২২ সালের দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন অভিনেত্রী আনোয়ারা। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠলেও অভিনয়ে আর ফেরার মতো অবস্থা তাঁর নেই। এখন মেয়ে মুক্তির সঙ্গে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যান। এ ছাড়া নামাজ-রোজায় কাটে তাঁর দিন। ১৯৬১ সালে ১৪-১৫ বছর বয়সে অভিনেতা আজিমের মাধ্যমে তিনি চলচ্চিত্রে আসা অভিনেত্রী আনোয়ারা ২০০০ সালের প্রথম পর্যন্ত অভিনয়ে সক্রিয় ছিলেন। এ অভিনেত্রীর সর্বশেষ ২০১৯ সালে অভিনীত ও মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি হচ্ছে ‘মা’।

সন্তান, নাতি-নাতনিদের নিয়ে শাবানা

নব্বই দশকের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী হন অভিনেত্রী শাবানা। সেখানে স্বামী, সন্তান আর নাতি-নাতনিদের নিয়ে বেশ ভালো সময় কাটছে তাঁর। ঘরের কাজ, নামাজ-রোজা আর টিভি দেখা ও বই পড়তেই এখন আনন্দ তাঁর বলে জানান ঢাকাই চলচ্চিত্রের এ কিংবদন্তি বিউটিকুইন। ১৯৬২ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে এহতেশামের ‘নতুন সুর’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে শাবানার অভিনয় শুরু। তখন তাঁর নাম শাবানা ছিল না। রত্না নামেই অভিনয়ে যাত্রা। ১৯৬৭ সালে ১৪ বছর বয়সে এহতেশাম পরিচালিত ‘চকোরী’তে শাবানা নাম ধারণ করে নায়িকা হন তিনি। শাবানা সর্বশেষ অভিনয় করেন ১৯৯৯ সালে চিত্রনির্মাতা আজিজুর রহমানের ‘ঘরে ঘরে যুদ্ধ’ চলচ্চিত্রে।

ঘরের কাজ নিয়ে ব্যস্ত সুচন্দা

নামাজ-রোজা আর ঘরের কাজ নিয়েই ব্যস্ততা। এ ছাড়া বই পড়েন, টিভি দেখেন-এভাবেই কেটে যায় সময় বলে জানান অভিনেত্রী সুচন্দা। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে আসা এ কিংবদন্তি অভিনেত্রী নব্বই দশকের শেষ ভাগে অভিনয় ছাড়েন। এখন বনানীতে ছেলেমেয়ে আর নাতি-নাতনিদের সঙ্গেই সময় কাটান। সময় পেলেই চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে ভাইদের কাছে বেড়াতে। সন্তান, নাতি-নাতনি আর বোন ববিতা ও চম্পাকে নিয়ে গল্প করে সময় কেটে যায় বলে জানান তিনি।

কানাডায়ই বেশি সময় কাটে ববিতার

ঘরের কাজ, কানাডায় ছেলে অনিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে ভাইদের কাছে সময় পেলেই ছুটে যাওয়া। ইউটিউবে পুরোনো দিনের সিনেমা দেখা অন্যান্য কাজের ফাঁকে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ডিসিআইআইয়ের প্রতিনিধি হিসেবে বিশ্বব্যাপী অসহায় শিশুদের কল্যাণেও কাজ করে যাওয়া-এসবই এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাপন বলে জানান অভিনেত্রী ববিতা। ষাটের দশকে চলচ্চিত্রে আসা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা সর্বশেষ অভিনয় করেন ২০১৫ সালে ‘পুত্র এখন পয়সাওয়ালা’ ছবিতে।

রাজবাড়ীতেই বেশি সময় কাটে রোজিনার

২০২১ সালে সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সিনেমা ‘ফিরে দেখা’ পরিচালনা ও এতে শেষ অভিনয় ছিল রোজিনার। গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ীতে মসজিদ নির্মাণ করেছেন। এখন কখনো ঢাকা আবার কখনো রাজবাড়ীতে ঘুরে বেড়িয়ে সময় কাটে এ জনপ্রিয় অভিনেত্রীর বলে জানান তিনি। সত্তরের দশকে ‘জানোয়ার’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আসা অভিনেত্রী রোজিনা ২০০০ সালের প্রথমদিকে যুক্তরাষ্ট্র চলে যান। ২০০৫ সালে আবার দেশে ফিরে প্রখ্যাত চিত্রনির্মাতা মতিন রহমানের ‘রাক্ষুসী’ ছবিতে অভিনয় করেন।

ধর্মকর্ম আর বই পড়ায় ব্যস্ত সোহেল রানা

‘এখন বয়স হয়েছে। শরীরের যেমন সীমা আছে, তেমনি মনেরও ক্লান্তি আছে। এ বয়সে এসে মনে হচ্ছে, এখন থামার সময়। তাই থামলাম।’ কথাগুলো অভিনেতা মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানার। স্বাধীন দেশে ১৯৭২ সালে প্রথম মুক্তযুদ্ধভিত্তিক ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রের প্রযোজক মাসুদ পারভেজ। সত্তরের দশকে ‘মাসুদ রানা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সোহেল রানা নামে অভিনয়ে আসেন। দীর্ঘদিন ধরে অভিনয় থেকে দূরে আছেন তিনি। বাসায় টিভি দেখা, বই পড়া, নামাজ-রোজা পালনসহ চলচ্চিত্র জগতের নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন তিনি।

ঘর-সংসারে ব্যস্ত আছেন সুচরিতা

মনের মতো চলচ্চিত্র ও চরিত্র না পাওয়ায় অভিনয়ে ২০০০ সালের প্রথম দিক থেকে অনিয়মিত হয়ে পড়েন সুচরিতা। এখন ঘর-সংসার নিয়েই তাঁর সময় কাটে বলে জানান তিনি। ১৯৭৬ সালে গাজী মাজহারুল আনোয়ার প্রযোজিত ও দিলীপ বিশ্বাস পরিচালিত ‘সমাধি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে নায়িকা হন সুচরিতা। এর আগে ‘বেবী হেলেন’ নামে সিনেমায় শিশুশিল্পীর ভূমিকায় অভিনয় করতেন। আশির দশকের শেষদিকে সংসারের কারণে চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান তিনি। আবার ২০০০ সালে অভিনয়ে ফিরে আসেন। অভিনয় করেন মা, ভাবির চরিত্রে। এরপর একসময় পছন্দের চরিত্র না পেয়ে অনিয়মিত হন চলচ্চিত্রে।

আক্ষেপ নিয়ে চলে গেলেন নাসিমা খান

হারানো ছেলেকে ফিরে না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রের একসময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নাসিমা খান। গত রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এ অভিনেত্রী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ১৯৫৯ সালে ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেক নাসিমা খানের। এরপর ১৯৬১ সালে ‘যে নদী মরু পথে’ সিনেমায় নায়িকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। এ সিনেমার মাধ্যমে দর্শকমহলে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এ অভিনেত্রী। ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করে নিজের অবস্থান তৈরি করেন নাসিমা খান। সে সময়ের চলচ্চিত্রাঙ্গনে তিনি ছিলেন পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মনে জায়গা করে নেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১১ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম প্রযোজিত ‘কুসুম কুসুম প্রেম’ চলচ্চিত্রে সর্বশেষ তাঁকে পর্দায় দেখা যায়। চলচ্চিত্র ছাড়াও অসংখ্য টিভি নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। নাসিমা খানের মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের সঙ্গে যুক্ত এক অভিনেত্রীর অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তাঁর মৃত্যুতে চলচ্চিত্রাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি আশুলিয়ার পাথালিয়া ইউনিয়নের নিরিবিলি স্বপ্ন বিলাশ থেকে নিখোঁজ হন নাসিমা খানের ছোট ছেলে নাবিল নাছির রহমান কুশল। তবে দীর্ঘ সময়েও ছেলের কোনো খোঁজ পাননি। একপর্যায়ে হতাশ এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। নাসিমার দেখাশোনা করতেন নুরজাহান বেগম। তাঁর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বেশ কিছুদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন অভিনেত্রী। সাত দিন আগে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। হয়তো তাঁর চিরবিদায়ের সময় ছেলেকে না পাওয়ার আক্ষেপও ছিল। জীবদ্দশায় শেষ দেখাটা হলো না বড় ছেলের সঙ্গেও। বড় ছেলে শাবাব নাসিম রহমান যুক্তরাষ্ট্র থাকেন। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফিরতে রওনা হয়েছেন তিনি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১৫ অক্টোবর উপস্থিত থেকে মায়ের জানাজা ও দাফনের আয়োজনে অংশ নেবন তিনি। অভিনেত্রীর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নাসিমা খানের মৃতদেহ রাজধানীর একটি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।

দক্ষ অভিনেত্রী ছিলেন : শাবানা

কিংবদন্তি অভিনেত্রী নাসিমা খানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন আরেক কিংবদন্তি অভিনেত্রী শাবানা। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী এ অভিনেত্রী বলেন, সিনিয়র শিল্পীরা সবাই একে একে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, সেই ধারাবাহিকতায় নাসিমা আপাও চলে গেলেন। যদিও আমরা দুজন একসঙ্গে কোনো সিনেমায় অভিনয় করিনি কিন্তু তাঁর দক্ষ অভিনয় আমার মন কেড়েছে। তাঁর কাছ থেকে শেখার অনেক কিছুই ছিল। ব্যবহারও ছিল বড্ড অমায়িক। হাসিখুশিতে সবাইকে মাতিয়ে রাখতে তাঁর জুড়ি ছিল না। এত বড় মাপের অভিনেত্রী হয়েও তাঁর মধ্যে ছিল না কোনো অহংকার। বাংলা ও উর্দু সিনেমায় সমান পারদর্শিতায় অভিনয় করে গেছেন তিনি। আমি যুক্তরাষ্ট্র চলে আসার পর তাঁর সঙ্গে আমার আর কখনো যোগাযোগ হয়নি। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে খুব কষ্ট পেলাম। দোয়া করি আল্লাহ তায়ালা যেন তাঁকে জান্নাতবাসী করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights