শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর হুঁশিয়ারি

বিশেষ প্রতিনিধি

বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় নেতা-কর্মীদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান। সাম্প্রতিক সময়ে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ সম্পর্কে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান। সামগ্রিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে দলের প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ এলাকায় ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করে শক্ত অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও তৃণমূলের প্রত্যাশা-ক্ষোভ সামলানো এবং যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় ঐক্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদে সরকারি দলের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংসদের পরবর্তী অধিবেশনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার প্রায় দেড় মাস আগেই সংসদীয় দলের এই জরুরি সভা ডাকা হয়। বৈঠকে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনের ক্ষেত্রে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন থেকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই করার নির্দেশনা দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারে বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরাচারের কোনো দোসর বা সমর্থককে প্রার্থী না করারও নির্দেশ দেন তিনি। আসন্ন দুর্গাপূজাসহ সব সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। একটি মহল দেশের বিশেষ বিশেষ জায়গায় সহিংসতা ও মব তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এভাবে তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে চায়। এ ব্যাপারে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব এমপিকে এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংবিধান সংশোধন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদের পরবর্তী অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সারা দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ও জরুরি নির্দেশনা দেওয়ার জন্যই মূলত এই সভা আহ্বান করেন সংসদ নেতা তারেক রহমান। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সারা দেশে দলীয় প্রতিনিধিদের বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেন তিনি। বিশেষ করে সভায় দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দলের কতিপয় নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি ও অনিয়মের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংবিধান সংশোধন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলোচনায় স্থান পায়। দলের সাংগঠনিক বিষয়েও দিকনির্দেশনা দেন বিএনপিপ্রধান।

শৃঙ্খলা রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি : দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক নানা শৃঙ্খলাবিরোধী অভিযোগ সম্পর্কে কঠোর অবস্থান নেয় বিএনপি হাইকমান্ড। বিশেষ করে রাজধানীর মিরপুরে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র রাড্ডায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা। এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত চলছে। ঘটনাটির পর ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিসহ তিনটি কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ জন নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর বার্তা ইতোমধ্যেই দলীয়ভাবে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী-এমপিরা। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি স্মরণ করে দেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

স্থানীয় নির্বাচন ও দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থা : সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে নেতারা বলেন, ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য বৃহৎ বিরাট এক সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ এই নির্বাচন। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলের প্রত্যাশা ও ক্ষোভ সামলানো, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাই-এসবই বিএনপির জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। নির্বাচনের সময়সূচি ও প্রস্তুতি নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে তৃণমূলের অবস্থান নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা। সংসদীয় দলের সভায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিসহ মোট ১৫ জন বক্তব্য রাখেন। তার মধ্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম উল্লেখযোগ্য।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, সম্পূর্ণ একটি ভঙ্গুর অবস্থায় আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছি। যখন দেশের অর্থনীতি ছিল সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। আইনশৃঙ্খলা থেকে শুরু করে প্রতিটি সেক্টর প্রায় ধ্বংস করে দিয়ে গিয়েছিল পতিত স্বৈরাচারী সরকার। প্রত্যেকটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে গিয়েছিল তারা। সেই অবস্থায় আমরা দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা আর কোনো নীতি-নৈতিকতাহীনতা বরদাশত করব না। সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে তাদের স্ব স্ব এলাকায় শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এজন্য তাদের আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। তা ছাড়া সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখাটা বিএনপির জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

ফলে কমিটি পুনর্গঠন, মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে সিদ্ধান্ত এবং নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা-এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনায় স্থান পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights