সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে চায় সরকার : নৌপরিবহনমন্ত্রী

সমুদ্রসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কারিগরি জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

তিনি বলেছেন, সমুদ্র অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এ জন্য সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) বাংলাদেশের মেরিটাইম ও অফশোর শিল্পের আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ‘৮ম বিমক্স ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেভর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর ৭০ শতাংশ জলরাশি। যারা এই জলরাশি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারছে, তাদের জন্য তা সম্পদে পরিণত হচ্ছে। আর যারা ব্যবস্থাপনা করতে পারছে না, তাদের জন্য তা অভিশাপ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বাংলাদেশ সমুদ্র, নদী ও জলসম্পদে সমৃদ্ধ হলেও এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ রবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে প্রায় ১৬ হাজার কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত রয়েছে। কিন্তু এসব সম্ভাবনার পূর্ণ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। সীমাবদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় জ্ঞানের অভাবে যেসব সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি, সেগুলো কাজে লাগাতে সরকার নতুন করে উদ্যোগ নিতে চায়।

বন্দর অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়ে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাতারবাড়ীতে আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ চলছে। ২০৩০ সালে এটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দরকেও কার্যকরভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যদিও এ ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

বন্দর পরিচালনা ও বিনিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনালের ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের তিনটিকে বাংলাদেশে আনতে সক্ষম হয়েছে সরকার। লালদিয়া টার্মিনালে ডেনমার্কের এপি মোলার কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

সমুদ্রসম্পদ আহরণের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেখ রবিউল আলম বলেন, সমুদ্রের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গিয়ে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য ঝুঁকির মুখে ফেলা যাবে না। সমুদ্রসম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহার না করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে তা ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে এসব সম্পদ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণ, জাহাজ পুনর্ব্যবহার, বন্দর ব্যবস্থাপনা, শিপিংয়ের সরঞ্জাম ও লজিস্টিকসসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোকে আরও সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করতে হবে। যেসব দেশ এখনো আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পায়নি, তাদেরও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে।

সমুদ্রের অফশোর এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর ভারত ও মিয়ানমার তাদের অফশোর এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন শুরু করেছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকলেও বর্তমান সরকার অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে বলে তিনি জানান।

শিপিং খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে দক্ষ নাবিক ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অন্য দেশের তুলনায় প্রত্যাশিত অবস্থান অর্জন করা যায়নি। ফিলিপাইন এ ক্ষেত্রে ভালো করছে। সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে এ সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চায় সরকার।

জ্বালানির ভবিষ্যৎ নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্কের প্রসঙ্গে শেখ রবিউল আলম বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি অব্যাহত রাখা হবে, নাকি সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তর করা হবে-এ নিয়ে উন্নত বিশ্বে বিতর্ক রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও ন্যায্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তিতে রূপান্তর প্রয়োজন, তবে তা রাতারাতি সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের নিরাপত্তা, পরিবেশের সুরক্ষা, মানুষের কল্যাণ, অগ্রগতি ও সম্প্রীতিকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চায়। সমুদ্র ও জলসম্পদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights