সিঙ্গাপুরের সরকারি ডেটিং প্ল্যাটফর্ম নিয়ে এতো আলোচনা কেন?

অনলাইন ডেস্ক

জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় তরুণ-তরুণীদের প্রেম ও বিয়ের সম্পর্কে উৎসাহিত করতে এক নতুন উদ্যোগে নেমেছে সিঙ্গাপুর সরকার। দেশের সরকারি কর্মচারীদের জন্য ‘ফার্স্টডেট’ নামের একটি বিশেষ ডেটিং প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে নগর-রাষ্ট্রটির প্রযুক্তি সংস্থা ‘গভটেক’। দেশটির অতি-নিয়ন্ত্রণমূলক সামাজিক নীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া এই উদ্যোগ নাগরিকদের মাঝে একই সাথে কৌতূহল, কৌতুক এবং সমালোচনার ঝড় তুলেছে।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নির্মিত এই প্ল্যাটফর্মটি নোবেল বিজয়ী একটি অ্যালগরিদমের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মূলত গভটেকের বার্ষিক হ্যাকাথন থেকে উঠে আসা এই উদ্যোগটি ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অবিবাহিত সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। অংশগ্রহণকারীরা তাদের জাতীয় ডিজিটাল আইডি ব্যবহার করে লগ ইন করার পর তাদের আগ্রহ, অভ্যাস ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত নানা প্রশ্নের উত্তর দেন। এর ভিত্তিতে অ্যালগরিদম তাদের একবারে একজন সম্ভাব্য সঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়। তবে সরকারি সংস্থার বাইরে সাধারণ মানুষের জন্য এই সেবা প্রসারিত করা হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি কর্তৃপক্ষ।

এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সিঙ্গাপুরের তীব্র জনসংখ্যা সংকট। ২০২৫ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে ৩০ হাজারের কম শিশু জন্মগ্রহণ করেছে, যার ফলে প্রজনন হার নেমে এসেছে রেকর্ড ০.৮৭-এ। সংকট মোকাবেলায় সরকার প্রতি সন্তানের জন্য জন্ম থেকে ১৭ বছর বয়স পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার সিঙ্গাপুরি ডলারের আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। ৬ মিলিয়ন নাগরিকের এই দেশে সংকুচিত ও দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাওয়া জনসংখ্যাকে এক অস্তিত্ব সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। উপ-প্রধানমন্ত্রী গান কিম ইয়ং হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, এখনই হস্তক্ষেপ না করলে ২০৪০-এর দশকের শুরুর দিকেই নাগরিক সংখ্যা কমতে শুরু করবে। কাজের চাহিদার জন্য দেশটি অভিবাসীদের ওপর নির্ভর করলেও তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ সন্তানহীন জীবনযাপন, পোষা প্রাণীর পেছনে সময় দেওয়া কিংবা দ্বিগুণ আয়ের সুবিধা উপভোগ করতেই বেশি পছন্দ করছে।

ব্যক্তিগত জীবনে সরকারের এই হস্তক্ষেপ অবশ্য সিঙ্গাপুরের জন্য নতুন কিছু নয়। ১৯৮৩ সালে দেশটির জাতির পিতা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ উচ্চশিক্ষিত নারীদেরদের দেরিতে বিয়ে ও কম সন্তান জন্ম দেওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। এর পর পরই চালু করা হয় বিতর্কিত ‘গ্রাজুয়েট মাদার্স স্কিম’ এবং গ্রাজুয়েট সিঙ্গেলদের সামাজিক মেলবন্ধনের জন্য ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ইউনিট’ (এসডিইউ)। সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব পলিসি স্টাডিজের গবেষক তান আরন সের জানান, অতীতের এসব চেষ্টা খুব একটা সাশ্রয়ী বা সফল না হলেও বর্তমান যুগের আমলারা প্রযুক্তির শক্তিতে ভর করে ফের ভালোবাসার বাজারে নামছেন। অবশ্য এই অ্যালগরিদম নির্ভর ডেটিংয়ের পেছনে ১৯৬২ সালের ‘গেল-শাপলি’ অ্যালগরিদম কাজ করছে, যা সাধারণ ডেটিং অ্যাপের মতো সোয়াইপ করার বদলে একটি নির্দিষ্ট নিখুঁত ম্যাচ উপহার দেয়।

সরকারি এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নুরি আয়েশা নামের ৩০ বছর বয়সী এক সরকারি চাকরিজীবী কৌতূহল থেকে এতে সাইন আপ করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা হতাশ। উচ্চ আবাসন ও শিশু পরিচর্যার খরচের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রচলিত ডেটিং অ্যাপগুলো থেকে ভালো সাড়া না পাওয়ায় তিনি এটি চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে, এডুকেশন খাতে কর্মরত জেমি নামে আরেক কর্মকর্তা এটিকে কিছুটা বিব্রতকর বলে অভিহিত করেছেন। অতিরিক্ত কাজের চাপ, ক্লান্তি এবং তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা নিয়ে শঙ্কার কারণে তিনি এতে অংশ নেননি। এছাড়া সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বাসা ভাড়া ও যাতায়াতের উচ্চ খরচের কারণে সিঙ্গাপুরে তরুণদের প্রেম ও বিবাহের হার কমছে। এই অ্যালগরিদম মানুষের জটিল অনুভূতির সমাধান করতে পারবে কি না কিংবা আবাসন ব্যবস্থার টানাপোড়েন ঘোচাতে পারবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থেকেই যাচ্ছে। তবুও সরকারি কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রের তালিকায় ভালোবাসার ম্যাচ খুঁজে পাওয়া এখন সিঙ্গাপুরের রাজনীতি ও সমাজযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সূত্র: আল জাজিরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights