সেদিন শাবনূরের বাসায় থাকাটাই আমার ভুল ছিল

অভিযোগপ্রখ্যাত অভিনেত্রী ডলি জহুর প্রায় পাঁচ দশক ধরে জনপ্রিয়তার সঙ্গে অভিনয় করে যাচ্ছেন। নায়ক সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডে শাবনূরকে সহযোগিতা করেছেন এই অভিনেত্রী-এমন অভিযোগ করে আসছেন সালমানের মা নীলা চৌধুরী। বর্তমান ব্যস্ততা ও এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতায় এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন – আলাউদ্দীন মাজিদ

কেমন আছেন?

আর কেমন থাকব বলেন, বয়স হয়েছে। এই বয়সে কতটা ভালো থাকা যায়। তবু নিজেকে নিজের ভালো রাখতে হয়।

অভিনয় নিয়ে এখন ব্যস্ততা কেমন?

হ্যাঁ, এখনো অভিনয় করে যাচ্ছি। এই তো এখন একটি নাটকের শুটিং করছি। আসলে, এই বয়সে কি অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত থাকা যায়। তারপরও দর্শকের দিকে তাকিয়ে আমার প্রতি তাদের ভালোবাসার কথা ভেবে পর্দায় নিজেকে উপস্থাপন করে যাচ্ছি। এ আর কি।

এবার নায়ক সালমান প্রসঙ্গে আসি, তাঁর মৃত্যুর ঘটনায় শাবনূরকে সহযোগিতা করেছেন বলে আপনার বিরুদ্ধে সালমানের মা অভিযোগ করে আসছেন, কী বলবেন?

আসলে কেন আমার বিরুদ্ধে সালমানের মা শাবনূরকে সহযোগিতা করার ভিত্তিহীন অভিযোগ করে যাচ্ছেন তার কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। যেদিন সালমান মারা যায় সেদিন শাবনূরের বাসায় থাকাটাই আমার বড় ভুল হয়ে গেছে। এ কারণেই আজ আমার বিরুদ্ধে এত অমূলক ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হচ্ছে।

সেদিন কেন শাবনূরের বাসায় ছিলেন?

অভিনয় শিল্পী যারা মেকআপ নেন তাদের সবার কমবেশি স্কিন এলার্জি হয়। আমার তো মুখ, কিন্তু শাবনূরের গলার কাছে যেহেতু খোলা থাকে, সেখানেও মেকআপ নিতে হয়। তাই ওর এলার্জিটা অনেক বেশি। ও সিঙ্গাপুরের চিকিৎসা করাতে গেল। তো সিঙ্গাপুর থেকে দুই দিন আগে ফিরেছে, আমার মনে হলো ওকে যে প্রেসক্রিপশনটা দিয়েছে সেটা দেখি। সেই ভেবে বাসা থেকে বলে বের হলাম। ওর বাসা কাছেই, সেদিন ছিল শুক্রবার। রাস্তাও ফাঁকা, আমি গ্রিন রোড ভূতের গলি থেকে বের হয়ে রিকশা নিয়ে ওর বাসায় গেলাম। আসলে এ কারণেই সেদিন ওর বাসায় আমার যাওয়া।

শাবনূরের বাসায় থাকা অবস্থাতেই সালমানের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন?

হ্যাঁ, ওর বাসায় থাকার সময়ই একটা ফোন এলো। শাবনূর সেই ফোন আমাকে রিসিভ করতে বলেছিল, ও আমাকে বলল আন্টুস তুমি ফোনটা ধরো, ও আমাকে আন্টি বলে না, আন্টুস বলে। আর ও ল্যান্ডফোন ধরে না। একটা ছেলে ফোন দিয়ে ওই পাশ থেকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে ভাবি নাকি?’ ফোন দিয়েছে মণ্ডল নামে একজন ডিরেক্টর। সে আমার গলা শুনেই চিনে ফেলেছে। আসলে তখন আমরা এমনই ছিলাম, গলা শুনেই চিনে ফেলতাম। মণ্ডল বললেন, ‘ভাবি আপনি জানেন, সালমানকে হলি ফ্যামিলিতে নিয়ে আসছে, ও অ্যাকসিডেন্ট করেছে। আমি এখনই পরিচালক সমিতিতে খোঁজ নিতে যাচ্ছি। অবাক হলাম। আমি বললাম, তুই আমাকে ওখানে গিয়ে এক্ষুনি জানা।

তারপর কী হলো?

শাবনূর পাশ থেকে শুনে বলল কী হয়েছে, ওকে বললাম, সালমান নাকি অ্যাকসিডেন্ট করেছে। সে শুনে বলল, না ও কেন অ্যাকসিডেন্ট করবে। এরপর মণ্ডল নয়, ফোন করলেন দিলু ভাই। আমি কণ্ঠ শুনেই চিনে ফেললাম, বললাম, আমি ডলি জহুর বলছি। দিলু ভাই বললেন, ও ভাবি আপনি ওখানে, শুনছেন নাকি? আমি বললাম ‘হ্যাঁ, শুনলাম; কী খবর বলেন তো। উনি বললেন, খবর বেশি ভালো না। হলি ফ্যামিলি রাখে নাই। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাচ্ছি। আমি বললাম, ও আচ্ছা। আমাকে জানায়েন ভাই। এ ঘটনা শুনে শাবনূর নার্ভাস হয়ে পড়ে, আমারও হাত কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে যায়। এদিকে শাবনূর শুনে চিল্লাচিল্লি শুরু করল, প্রচণ্ড নার্ভাস হয়ে গেছে। বারবার বলছিল, আন্টুস আন্টুস যেতে হবে। আমি বলি চুপ থাক, দেখি, শুনি। ওকে বকাও দিলাম। আমরা অপেক্ষা করছি, তারপর পরিচালক শাহ আলম কিরণ ফোন দিল। ও ফোন রাখার পরই কে যেন ফোন দিল, বলল ও নাই। তারপর শাবনূরের চিল্লানি শুরু হলো।

তাহলে ওকে নিয়ে সালমানের মৃতদেহ দেখতে গেলেন না কেন?

নির্মাতা এহতেশাম শাবনূরকে নিয়ে বের হতে নিষেধ করেন। তিনি আমাকে কড়া নির্দেশ দেন, ‘নূপুরকে (শাবনূর) বাসা থেকে বের হতে দিও না। ওর মা মনে হয় বাসায় নেই। তুমি ওকে আটকে রাখো।’ শাবনূর অনেক কান্নাকাটি করছিল, বাসা থেকে বের হতে চাইছিল। কিন্তু ওর মা বাসায় নেই, আমি কীভাবে বের হই। শাবনূর পাগলামি শুরু করেছে। ওকে নিয়ে ওখানে যাওয়ার কথা ও বারবার বলছে। তখন আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছে, ওর কেমন লাগছে বলেন, ওর তো কো-আর্টিস্ট ছিল সালমান। সেদিন ওর বাসায় সারা দিন ছিলাম, রাত ১২টা পর্যন্ত ছিলাম।

তারপরও কো-আর্টিস্টের এমন করুণ মৃত্যুতে ওখানে যেতে শাবনূরকে কেন নির্মাতারা বারণ করছিলেন, আপনি তো ওকে নিয়ে যেতে পারতেন?

হ্যাঁ, সেটিই আমার করণীয় ছিল। শাবনূরও যেতে চেয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষ, চলচ্চিত্রের লোকজন এবং সাংবাদিকদের বিশাল ভিড় জমে গিয়েছিল হাসপাতাল আর এফডিসিতে। তখন এহতেশামসহ অন্যসব নির্মাতা ফোন দিয়ে ওখানে ওকে যেতে দিতে বারণ করে দিয়েছিলেন। এদিকে শাবনূরের মা বাসায় নেই। শাবনূরের মনের অবস্থা তখন বিধ্বস্ত। ওকে কীভাবে নিয়ে যাই বলেন। বা ওকে রেখেইবা আমি কীভাবে যাই বলেন।

শাবনূরকে নির্মাতারা কেন যেতে দিতে বারণ করেছিলেন?

আসলে সালমান আর শাবনূর যখন জুটি বেঁধে অভিনয় করত তখন তাদের নিয়ে প্রেমের গুঞ্জন উঠেছিল। সালমান অভিনীত ২৭টি সিনেমার মধ্যে ১৪টির নায়িকাই ছিল শাবনূর। এ কারণেই হয়তো এই প্রেমের গুঞ্জন চাউর হয়। আবার সালমানের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে অনেকের সন্দেহের তীর শাবনূরের দিকেই তাক করা ছিল। তাই এত মানুষের মধ্যে শাবনূর যদি সালমানকে দেখতে যেত তাহলে হয়তোবা আবেগী হয়ে মানুষ শাবনূরের ওপর আক্রমণ করে বসতে পারত। এ কারণেই নির্মাতারা ওকে যেতে দিতে বারণ করেছিলেন। তাই এই কঠিন পরিস্থিতিতে প্রিয় সহকর্মীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া সম্ভব হয়নি শাবনূরের পক্ষে।

সালমান-শাবনূরের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল?

আমি বলব তাদের মধ্যে শুধু কাজের সম্পর্ক ছিল। এর বাইরে আমি আর কিছু জানি না।

এখন আপনার বিরুদ্ধে করা অভিযোগ কীভাবে খণ্ডন করবেন?

সালমান শাহের মা-সহ যারা সালমানের মৃত্যুর ৩০ বছর পর এসেও প্রমাণ ছাড়া আমার বিরুদ্ধে যেসব ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন আমি সবাইকে বলব সালমানের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের স্বার্থে এসব বাদ দিয়ে প্রকৃত আসামিদের দিকে নজর দিন। না হলে হয়তো এমন ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কাদা ছোড়াছুড়ির কারণে ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়ে যেতে পারে। আমি বলব, আমার বিরুদ্ধে যতই ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হোক না কেন মিথ্যা দিয়ে সত্যকে কখনো ঢাকা যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights