১০০ কোটি ডলার সহায়তা চাইবে ঢাকা
আলী রিয়াজ
বাজেট সহায়তা হিসেবে জাপানের কাছে ১০০ কোটি ডলার চাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে দুই কিস্তিতে এ অর্থ চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আসন্ন জাপান সফরে দেশটির কাছে এ অর্থ সহায়তা নিয়ে কথা বলবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। চলতি ও আগামী অর্থবছরে ৫০ কোটি ডলার করে বাজেট সহায়তা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা, বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে আগামী ২৬ অক্টোবর চার দিনের সফরে জাপান যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সফরকালে বাজেট সহায়তার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৩১১ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছে বাংলাদেশ। এর বড় অংশ ব্যয় হয়েছে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও খাদ্যপণ্যের বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে। বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) এবং এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) থেকে এসব ঋণের বড় অংশ এসেছে। এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা পেয়েছিল বাংলাদেশ।
তবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এখন পর্যন্ত কোনো বাজেট সহায়তা ঋণ পাওয়া যায়নি। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গত বছর আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের (ওএফআইডি) কাছে বাজেট সহায়তা চেয়েছিল সরকার। এখন সংস্থাটির কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার সহায়তা পেতে চূড়ান্ত আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটি বাংলাদেশকে ১১ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দিয়েছিল।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জাইকার সঙ্গে বর্তমানে নতুন কোনো বাজেট সহায়তা ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছে না। অথচ গত অর্থবছরে সংস্থাটি বাংলাদেশকে ৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪১ কোটি ৪০ লাখ ডলার বাজেট সহায়তা দিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকারের ব্যয় বাড়ছে। এ চাপ সামাল দিতেই জাপানের কাছ থেকে নতুন করে বাজেট সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এডিবির কাছ থেকে কয়েকটি বাজেট সহায়তা ঋণ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
তবে এসব ঋণ আগামী মার্চের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে পণ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। একই সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ তৈরি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কঠোর ব্যয় সংকোচনমূলক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সংস্থাটি বাংলাদেশকে ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন করে। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় তেল ও এলএনজির দাম আরও বেড়েছে। এতে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়ছে। বছরের পর বছর ভর্তুকি বাড়তে থাকায় সরকারের পরিচালন ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আরও বাজেট সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে সরকার।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারের বাজেট ব্যয় যতটা সম্ভব কমানো প্রয়োজন। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আমদানি কমবে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও হ্রাস পাবে।
বিনিময় হারকে নমনীয় রাখার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের মধ্যে ব্যবধান না রাখার পরামর্শ দেন। তাঁর মতে, এসব পদক্ষেপ অর্থনীতির ওপর চাপ কমাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা সহজ করতে সহায়তা করতে পারে।
