৭ দেশের তেল স্থাপনা, ইন্টারনেট কেবল ও এআই হাবে হামলা চালানোর হুমকি ইরানের
অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন সামরিক হামলার আশঙ্কায় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নজিরবিহীন পাল্টা আঘাতের চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, নতুন করে যদি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কোনো আক্রমণ শুরু করেন, তবে ইরানের প্রতিক্রিয়ায় সীমা থাকবে না। সেক্ষেত্রে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশে থাকা তেল স্থাপনা, ভূগর্ভস্থ ইন্টারনেট ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সুবিধাগুলোতে সরাসরি হামলা চালানো হবে বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তেহরান।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মহসেন রেজাই সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই এমন পরিস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না যেখানে ইরানের অর্থনৈতিক জীবনরেখায় হামলা চালানো হবে আর সেই হামলা পরিচালনায় সহায়তাকারী অঞ্চলের অর্থনৈতিক অবকাঠামো সুরক্ষিত ও অক্ষত থাকবে। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী তিনি জানান, যুদ্ধ পুনঃরায় শুরু হলে সমুদ্রগর্ভস্থ ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও এআই সুবিধাগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে এবং এবার দেশটির পরিকল্পনা হবে আরও বিস্তৃত।
একই সুর মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মেহেদি মোহাম্মাদি জানিয়েছেন, তেহরান পরবর্তী সম্ভাব্য যেকোনো সংঘাতকে তাদের অস্তিত্বের সংকট হিসেবে বিবেচনা করছে। দুই বছরের মধ্যে তৃতীয়বারের মতো ঘটা এই যুদ্ধ ইরানের টিকে থাকার লড়াই বিধায় তাদের রণকৌশলে এবার কোনো বাধা বা সীমারেখা থাকবে না। মোহাম্মাদি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরান এই যুদ্ধের সময় ও স্থানের মাত্রা ভেঙে দেবে। অর্থাৎ শত্রুপক্ষের ধারণার চেয়েও বহুগুণ বেশি সময় ধরে এবং অনেক বিস্তৃত ভৌগোলিক এলাকায় এই যুদ্ধ ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সম্প্রতি মার্কিন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে যৌথ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে মার্কিন সামরিক উপদেষ্টারা ইতিমধ্যে সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর একটি বিশদ তালিকা তৈরি করেছেন। এর মধ্যেই তেল আবিবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যৌথ হামলার সময় ও উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের আলোচনা হলেও সফলতার কোনো সুনির্দিষ্ট গ্যারান্টি তাদের হাতে নেই। বৈঠকে নেতানিয়াহু এমন আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যে, ইরান যেন আগে আক্রমণ চালায়। তবে রাজনৈতিক দিক থেকে ট্রাম্প প্রশাসন নভেম্বরের আগেই অঞ্চলটিতে তিনটি বিমানবাহী রণতরী, হাজার হাজার মেরিন সেনা, যুদ্ধবিমান ও স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস মোতায়েন শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার এই তীব্র উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতেও। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কারে ইরানি হামলার খবরের পরপরই অপরিশোধিত আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১৩.৪ ডলারে উঠে গিয়ে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রেজা নাসরি চরম ভয়াবহতার চিত্র তুলে ধরে বলেছেন, যুদ্ধের এই তৃতীয় তরঙ্গ এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। গোটা অঞ্চলের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি শোধনাগার, রিফাইনারি ও বন্দরগুলো আগুনে জ্বলবে। কোটি কোটি মানুষ পানি ও বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়বে এবং আরব বিশ্ব থেকে ইউরোপের দিকে বিশাল শরণার্থী স্রোত তৈরি হবে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক চরম মন্দায় ধসে পড়বে।
বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ঘনিষ্ঠ ফার্স বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হলে এবং কোনো ইরানি কর্মকর্তা বা সাধারণ বেসামরিক নাগরিক নিহত হলে ইরান সামরিক লক্ষ্যবস্তুর বাইরে রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোতেও সরাসরি আঘাত হানার নির্দেশ দিয়ে রেখেছে।
অন্যদিকে তীব্র উত্তেজনার মাঝেও পাকিস্তান ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে একটি যুদ্ধবিরতি ও চুক্তি সংশোধনের কূটনৈতিক পথ খোঁজা হচ্ছে। যেখানে জাতিসংঘ পরিদর্শকদের পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শনের অনুমতি, ইউরেনিয়াম রফতানি ও অবরোধ প্রত্যাহারের বিনিময়ে অবরুদ্ধ কোটি কোটি ডলারের সম্পদ ফেরতের প্রস্তাব রয়েছে। তবে ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আগে না তুললে তারা এসব আলোচনা বা প্রণালির অবরোধ প্রত্যাহার করবে না।
সূত্র: গার্ডিয়ান
