অপ্রদর্শিত ও পাচারের টাকা বিনিয়োগে ফেরানোই প্রধান লক্ষ্য
অনলাইন ডেস্ক
উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের সংকট অর্থনীতির গতি বাধাগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে দেশ থেকে অর্থ পাচার এবং দেশের ভেতরে অপ্রদর্শিত অর্থের বড় অংশ উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বাইরে থাকায় মূলধনের সংকট আরো প্রকট হয়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ব্যাংক খাতের সংস্কার, ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
প্রশ্ন : দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
উত্তর : আমরা অত্যন্ত জটিল ও ভঙ্গুর একটি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। দেশের মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছে।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের সঞ্চয় কমেছে, বহু পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। শিল্প ও বাণিজ্য খাতেও সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক কারখানা বন্ধ বা উৎপাদন সক্ষমতার নিচে পরিচালিত হচ্ছে। এর ফলে কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমরা পেয়েছি দুর্বল অর্থনীতি, ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং ব্যাংকিং খাতে গভীর অনিয়মের বোঝা। এসব সমস্যা মোকাবেলা করে অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনাই আমাদের প্রধান কাজ।
প্রশ্ন : বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থনীতির প্রধান তিনটি চ্যালেঞ্জ কী?
উত্তর : আমরা তিনটি মৌলিক চ্যালেঞ্জকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রথমত, কর্মসংস্থানের সংকট।
শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়া, নতুন বিনিয়োগের ঘাটতি এবং ব্যাবসায়িক অনিশ্চয়তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। খেলাপি ঋণ, অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন এবং তারল্য সংকট ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা। শিল্প উৎপাদন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ অপরিহার্য। কিন্তু দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা ও আমদানিনির্ভরতা জ্বালানি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এই তিনটি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে পাচার ও বিপুল অঙ্কের অপ্রদর্শিত অর্থ কিভাবে বিনিয়োগে আনা যায়?
উত্তর : অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও মূলধনকে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও জোরদার করতে হবে।
প্রথমত, অর্থনৈতিক লেনদেনের ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। বাংলা কিউআর এবং আন্ত ব্যবহারযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণের মাধ্যমে লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো হবে। নাগরিকের আর্থিক লেনদেনকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ৬০ হাজার কোটি টাকার সমন্বিত অর্থায়ন প্যাকেজ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যোগ্য উদ্যোক্তারা নির্ধারিত শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ পাবেন।
তৃতীয়ত, পুঁজিবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি কার্যকর উৎস হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইকুইটি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাংক খাতের অনিয়ম ও অর্থপাচারের ঘটনা চিহ্নিত করতে অ্যাসেট কোয়ালিটি রিভিউ এবং ফরেনসিক অডিটের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
আমাদের লক্ষ্য ব্যাংকিং খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা, পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়কে শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগে বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা।
প্রশ্ন : বন্ধ কারখানা চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য কেমন পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে?
উত্তর : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেন। আমরা সেগুলোকে নীতিনির্ধারণের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করছি।
প্রথমত, বিনিয়োগকারীরা জানতে চান আগামী কয়েক বছরে করনীতি, শুল্কনীতি ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন কেমন থাকবে।
দ্বিতীয়ত, সহজ ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকস, চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পাট ও পাটজাত পণ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি নিরাপত্তা। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য জ্বালানি অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ চলছে।
চতুর্থত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও লালফিতার দৌরাত্ম্য কমানো। ব্যবসা শুরু করতে দীর্ঘ সময় ও বিভিন্ন দপ্তরের অনুমতির প্রয়োজন হয়। আমরা সিঙ্গল উইন্ডো ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া ১৪ দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছি।
পঞ্চমত, যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন। রেল, সড়ক ও সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।
প্রশ্ন : ২০৩০ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
উত্তর : বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণ সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। করের আওতা সীমিত, কর ফাঁকি এবং বিভিন্ন ধরনের কর অব্যাহতির কারণে রাজস্ব আহরণ কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। আমরা এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছি।
প্রথমত, কর ফাঁকি ও জালিয়াতি বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে ডিজিটাইজ করতে হবে। এতে করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ কমবে এবং হয়রানি হ্রাস পাবে।
তৃতীয়ত, করের অর্থ কিভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকরা যখন বুঝতে পারবেন তাঁদের দেওয়া কর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তায় ব্যয় হচ্ছে, তখন কর দেওয়ার আগ্রহও বাড়বে।
প্রশ্ন : উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কী?
উত্তর : দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এক দিনে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা, বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৪১ লাখ পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে।
কৃষকদের সহায়তায় ফার্মারস কার্ডসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কৃষি উৎপাদন খরচ কমানো, জ্বালানি ও সারের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও আমাদের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
প্রশ্ন : বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ও অন্য উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে অর্থায়ন আলোচনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগের বর্তমান অবস্থা কী?
উত্তর : আইএমএফের সঙ্গে নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা নিয়েও আলোচনা করা হচ্ছে।
আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সংস্কার অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থায়ন নিশ্চিত করা। শুধু ঋণ নেওয়া নয়, সেই অর্থ কিভাবে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। জাপানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী পাঁচ বছরে এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বিনিয়োগের প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান শেভরনও বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে।
আমাদের দায়িত্ব হলো এসব প্রস্তাবকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা, অবকাঠামো ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা।
প্রশ্ন : এক বছরে অর্থনীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে সরকার কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে?
উত্তর : অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য আমাদের তিনটি পর্যায়ের কৌশল রয়েছে।
প্রথমটি রিকভারি বা পুনরুদ্ধার। এর আওতায় অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত ও উৎপাদনব্যবস্থায় গতি ফিরিয়ে আনা হবে।
দ্বিতীয়টি রেস্টোরেশন বা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
তৃতীয়টি রিকনস্ট্রাকশন ফর এক্সিলারেশন বা ত্বরান্বিত উন্নয়নের জন্য পুনর্গঠন। এর লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করা।
আমার ব্যক্তিগত অঙ্গীকার হলো অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। সংস্কারের উদ্দেশ্য শুধু কিছু নীতিগত পরিবর্তন নয়; এর প্রকৃত লক্ষ্য মানুষের জীবনমান উন্নত করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটানো।
প্রশ্ন : মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
