অর্থদাতাদের খোঁজে গোয়েন্দারা
ইমরান রহমান
ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষমতাচ্যুত কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। জুলাই আন্দোলনে সরকার পতনের পর বিদেশে পালিয়ে যাওয়া দলটির শীর্ষ নেতারা নতুন করে নাশকতার ছক কষছে। শ্রমিকদের আন্দোলনকে পুঁজি করে সারা দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে নাশকতায় নতুন করে অর্থ বিনিয়োগ করেছে ডজন খানেকের বেশি শীর্ষ নেতা। বিদেশে পলাতক এসব নেতার পক্ষে কর্মীদের এই টাকা পৌঁছে যাচ্ছে সমন্বয়কদের মাধ্যমে। শুধু যে বিদেশ থেকে টাকা আসছে তা নয়, দেশেও ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা ও ব্যবসায়ীরাও অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছেন।
গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের পরিকল্পনায় খুব বেশি সুবিধা করতে না পেরে এবার শ্রমিক আন্দোলনের মাঝে থেকে নাশকতা চালাতে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজধানীর মিরপুর, গাজীপুর ও সাভার-আশুলিয়ার ঘটনার পর গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে অর্থদাতা, টাকা বণ্টনের কৌশল, ইন্ধনদাতা ও সমন্বয়কদের নাম। বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা ও গাজীপুরে গা-ঢাকা দেওয়া কর্মীদের এই কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিনিময়ে থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ভালো পদ দেওয়ার প্রলোভন দেওয়া হচ্ছে। নাশকতাকারীদের মধ্যে বেশি উদ্বেগ ছড়াচ্ছে পদের প্রলোভনে নতুন করে দলে ভেড়ানো অতি উৎসাহী কিশোর বয়সি কর্মীরা।
গোয়েন্দা তথ্য জানিয়েছে, মিরপুর ১০ ও এর আশপাশ এলাকায় নাশকতায় আওয়ামী লীগের বড় একটি সমন্বয়ক টিম কাজ করেছে। এই টিমে ছিল ১২ জন সদস্য। যাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে ছয়জন। মিরপুরে নাশকতার অর্থদাতা হিসেবে নাম এসেছে সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লা, বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আবদুল মান্নান কচি ও শেখ হাসিনার একসময়ের পিয়ন বিপুল অর্থ পাচারে আলোচিত পানি জাহাঙ্গীর ওরফে জাহাঙ্গীর আলম। ৩টি ধাপে বিদেশ থেকে টাকা আসে নাশকতায় অংশ নেওয়া কর্মীদের হাতে। নাশকতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে আলাদা টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। প্রথমে অর্থদাতার কাছ থেকে সমন্বয়ক, তারপর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের মাধ্যমে ৫-৭ জনের ছোট গ্রুপের দলনেতাদের কাছে, সেখান থেকে নাশকতায় অংশ নেওয়া কর্মীদের হাতে পৌঁছায় টাকা।
নির্দেশনা মেনে ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর নিজের দলের সবাইকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তুলে পাঠালেই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে চলে আসে টাকা। সাতজনের একটি টিমের শুধু শ্রমিকদের আন্দোলনে অংশ নিতেই বরাদ্দ থাকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এরপর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ভিডিও পাঠালে আরও টাকা পাঠানো হয়। ভাঙচুরে ৩ হাজার টাকা ও অগ্নিসংযোগে ৫-১০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। মিরপুর-১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফের ফোনে পাঠানো হয় ৩টি মোবাইল থেকে। কিন্তু সেই টাকা আসার আগেই তাদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মেহেদী নামে এক তরুণ রয়েছে। সূত্র জানায়, ঘটনার আগের দিন নাশকতার প্রস্তুতির কথা জানানো ২৫টি হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপ শনাক্ত করেছে গোয়েন্দারা। যেসব গ্রুপে সকাল থেকেই নাশকতায় অংশ নেওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল। ২ শতাধিক নিষিদ্ধ দলের কর্মীর সমন্বয়কের দায়িত্বে ছিলেন- সাবেক এমপি ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা, মহানগর উত্তর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, যুবলীগ নেতা তাজুল ইসলাম বাপ্পি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের মামুন, পানি জাহাঙ্গীরের সহযোগী মাহবুবুল রহমান জুয়েল। ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ গ্রুপ বেশ শক্তিশালী হওয়ায় মিরপুরে আবারও বড় ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে ধারণা করছে গোয়েন্দারা। এদিকে রবিবার সকালে শ্রমিক বেশে তাদের কালসীতে জড়ো হতে বলা হয়। এরপর পাঠানো হয় মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে। সেখানে তারা বিচ্ছিন্নভাবে ঘোরাঘুরি করে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এর মধ্যে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশ মুখোমুখি অবস্থানে গেলে তারা পুলিশের ওপর আক্রমণের সুযোগ খুঁজতে থাকে। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতি বেশি থাকায় তাদের লাভ রোডে যেতে বলা হয়। লাভ রোড থেকে মিরপুর ১১ নম্বর মেট্রোস্টেশনের নিচে নাশকতা শুরু করে তারা। মিরপুর-১০ নম্বর থেকে পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স ঘটনাস্থলে আসতে আসতে নাশকতাকারীদের বড় অংশ মিরপুর ১২ নম্বরে অবস্থান নেয়। গ্রুপ নির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণের কথা থাকলেও পুলিশের ধাওয়ায় সেটি করতে পারেনি। মিরপুরের ঘটনায় ডিবির হাতে গ্রেপ্তার ১১ জনের মধ্যে মো. কামাল গাজী ও আরিফ আকন্দ মোবাইলে ছবি ও ভিডিও দেওয়ার পর তাদের মধ্যে কামালকে ৩৫০০ টাকা ও আরিফকে ৩ হাজার টাকা পাঠানো হয়। সূত্র বলছে, মিরপুর এলাকায় অর্থদাতা আওয়ামী লীগের ৩ নেতা ছাড়াও বিদেশে পলাতক ওবায়দুল কাদের, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি লিয়াকত শিকদার, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান ও মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. সাব্বির হোসেন অর্থায়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ডিবি মিরপুর বিভাগের ডিসি মোহাম্মদ রাকিব খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মিরপুরে নাশকতার পেছনে বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, তদন্তে যাদের নাম আসছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কে দেশে আছে, আর কে বিদেশে আছে- আইন সেটির ওপর নির্ভর করে চলে না। সুতরাং নাশকতার চেষ্টা কিংবা ইন্ধন দিলেই ব্যবস্থা।
