আইসিইউতে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো

শামীম আহমেদ

বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে দেশবিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বিপুল ব্যয়ে দেশজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি)। অথচ সেই প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোই এখন যেন আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে আছে। কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই, আবার কোথাও ভবন থাকলেও বছরের পর বছর প্রশিক্ষণই শুরু হয়নি। ভাড়া করা অস্থায়ী প্রশিক্ষক দিয়ে কোনো রকমে কোর্স চালানো হচ্ছে। মাঝপথে অস্থায়ী প্রশিক্ষক চলে গেলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কোর্স। অন্য ট্রেডের প্রশিক্ষককে মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বানানো হচ্ছে প্রধান প্রশিক্ষক।

এমন পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশে দক্ষতা তৈরির বদলে মিলছে শুধু সনদ। বিদ্যমান টিটিসিগুলোর এই দুরবস্থার মধ্যেই ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৫০টি টিটিসি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও দরপত্র প্রক্রিয়াও চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোকে কার্যকর না করে নতুন ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা কোথায়?

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে জানা যায়, দেশে ১০৪টি টিটিসি ও ৬টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল প্রায় ৪ হাজার ৬০০। কিন্তু অধিকাংশ কেন্দ্রই অর্ধেকের কম জনবল দিয়ে চলছে। কাগজকলমে ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও অনেক ট্রেড দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে দক্ষ কাঠমিস্ত্রির চাহিদা থাকলেও বন্ধ হয়ে গেছে কার্পেন্ট্রি ট্রেডটি। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও অনেক ট্রেডের মিল নেই। প্র্যাকটিক্যাল করানো হচ্ছে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে, যা এখন বিশ্ববাজারে অচল। আমাদের প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে জানিয়েছেন টিটিসিগুলোর করুণ চিত্র।

২০২১ সালে চালু হওয়া সুনামগঞ্জ টিটিসিতে ১০টি ট্রেড চালু থাকলেও এখন পর্যন্ত নিজস্ব জনবল একজনও নেই। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও অন্য কেন্দ্র থেকে মাত্র ১০ জনকে ডেপুটেশনে এনে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অস্থায়ী প্রশিক্ষক চলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে জাপানি ভাষা কোর্স। অথচ এই কোর্স সম্পন্ন করে অন্তত ১২ জন জাপানে গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করছেন।

নোয়াখালী টিটিসিতে ১৫টি কোর্সের জন্য ৪৫ জন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হলেও আছেন মাত্র আটজন। রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং কোর্সে দুই বছর ধরে কোনো প্রশিক্ষক নেই। পর্যাপ্ত ল্যাব ও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে সেগুলো কাজে লাগছে না। এমনকি মেশিনের ত্রুটিতে দুই মাস ধরে নিয়মিত বায়োমেট্রিক হাজিরাও নেওয়া যাচ্ছে না।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ টিটিসিতে অটোমেকানিকের সাতটি ট্রেডে ৩৫ জন প্রশিক্ষকের জায়গায় আছেন ১২ জন। ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন লেভেল-১ ট্রেডে দুই বছর ধরে ইন্সট্রাক্টর নেই। পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে প্র্যাকটিক্যাল করানোয় কর্মক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।

বরিশাল টিটিসিতে ৪৪টি প্রশিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত ২৬ জন। এক ট্রেডের প্রশিক্ষক দিয়ে অন্য ট্রেডের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গার্মেন্টস ট্রেডের প্রশিক্ষক লায়লা আফরোজ ফুড ও বেভারেজ বিষয়ে তিন দিনের বুনিয়াদি কোর্স করে ওই ট্রেডের প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্য প্রশিক্ষকদেরও একাধিক ভিন্ন ট্রেডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো কোনো প্রশিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে থাকেন না; এমনকি সাবেক প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়েও ক্লাস পরিচালনা করান। প্রশিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে করানোর অভিযোগও রয়েছে।

রাজশাহী টিটিসিতে বিনামূল্যে ফরম দেওয়ার কথা থাকলেও শর্ট কোর্সে ৬০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কোরিয়ান ভাষা কোর্সের নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও অন্য কোর্সে বাধ্যতামূলক ভর্তি করে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএমইটির অনুমোদন ছাড়াই সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে কোর্স পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

রংপুর টিটিসিতে অনুমোদিত ২১টি ইন্সট্রাক্টর পদের বিপরীতে আছেন ১১ জন। প্রশিক্ষকদের অভিযোগ, সরকার প্রশিক্ষণার্থীদের হাজিরার ভিত্তিতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ভাতা দেয়। সেই টাকার জন্য অনেকে কোর্সে ভর্তি হন, প্রশিক্ষণ কাজে লাগান না। রংপুর টিটিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ নেওয়া ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই তা কাজে লাগাতে পারছেন না। অন্যদিকে তারাগঞ্জে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নারী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি পাঁচ বছরেও চালু হয়নি। এখন সেটি পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।

নওগাঁয় ছয়টি অনুমোদিত কোর্সের জন্য ১০ জন ইন্সট্রাক্টরের প্রয়োজন হলেও আছেন সাতজন। তিনজন চিফ ইন্সট্রাক্টরের পদ ২০১৬ সাল থেকে শূন্য।

পাবনা টিটিসিতে ৭৮ জন জনবলের জায়গায় আছেন ৫৭ জন। ছয়টি প্রধান ট্রেডে ৩০ জন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হলেও আছেন ১৭ জন। আধুনিক প্র্যাকটিক্যাল যন্ত্রপাতিও নেই।

এ দুরবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ; ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ আধা-দক্ষ বা অদক্ষ। দক্ষতার ঘাটতির কারণে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীরা কম মজুরি পাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, টিটিসির নামে সারা দেশে ভবন তৈরি না করে বিভাগীয় ও বড় জেলা শহরগুলোতে ২০-২৫টি বিশ্বমানের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি করলে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হতো।

জানতে চাইলে বিএমইটির পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) শরিফা সুলতানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে জনবলের চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ৬০০। অর্ধেকের কম জনবল দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। অস্থায়ী প্রশিক্ষক দিয়ে কোর্স চালাতে হচ্ছে। ভালো সুযোগ পেলে তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন। জাপানি ভাষা কোর্সের অনেক প্রশিক্ষক জাপানে চলে গেছেন। তাই হাইব্রিড পদ্ধতিতে একজন প্রশিক্ষক একসঙ্গে একাধিক কেন্দ্রে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights