ধ্বংসস্তূপে মেলেনি লাশের খোঁজ

বিশেষ প্রতিনিধি ও কক্সবাজার প্রতিনিধি, কক্সবাজার থেকে

কক্সবাজার ইনানীর পাটুয়ারটেকে বাঁশ-কাঠের তৈরি ‘টুপটুপ রিসোর্ট’ ট্র্যাজেডির তৃতীয় দিন। আগুনের লেলিহান শিখায় সব কিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও বাতাসে এখনো ভাসছে পোড়া গন্ধ আর স্বজন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন পর্যটকের নাম থাকলেও ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার হয়েছে ১০ জনের কয়লা হওয়া লাশ। বাকি একজন কোথায়? তিনি কি আগুনের সময় রিসোর্টের ভিতরেই আটকা পড়েছিলেন, নাকি ভোরে সৈকতে হাঁটতে বের হয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সোমবার সকাল থেকে পোড়া ধ্বংসস্তূপে গতকাল আবার চিরুনি তল্লাশি চালিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে মেলেনি নতুন কোনো লাশের খোঁজ।

ধ্বংসস্তূপে ফায়ার সার্ভিসের দ্বিতীয় দফার তল্লাশি : সোমবার সরেজমিন পাটুয়ারটেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা স্তূপীকৃত পোড়া কাঠ, বাঁশ ও টিনের চালা সরিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজছেন। যেহেতু তিন তলা রিসোর্টটি ভেঙে নিচে পড়েছিল, তাই নিচে কেউ চাপা পড়ে থাকতে পারেন-এমন আশঙ্কায় এই তল্লাশি চালানো হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ মোরশেদ হোসেন জানান, ‘টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও আমরা ১০টি লাশ উদ্ধার করেছি। কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ধসে নিচে পড়ায় কেউ চাপা পড়ে আছে কি না, তা নিশ্চিত হতেই গতকাল (সোমবার) পুনরায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। তবে নতুন করে কোনো লাশ বা আলামত মেলেনি।’

নিখোঁজ পর্যটকের সন্ধানে প্রযুক্তির ব্যবহার : ধ্বংসস্তূপে লাশ না মেলায় এবার ১১তম নিখোঁজ পর্যটকের অবস্থান শনাক্তে প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে প্রশাসন। কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহান জানান, ‘নিখোঁজ ওই পর্যটক অগ্নিকান্ডের সময় রিসোর্টের ভিতরে ছিলেন নাকি বাইরে কোথাও ছিলেন, তা নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এবং আমাদের তদন্তকারী দল যৌথভাবে কাজ করছে। নিখোঁজ ব্যক্তির মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশন (সর্বশেষ টাওয়ার অবস্থান) ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে।’

মর্গের সামনে স্বজনদের অন্তহীন অপেক্ষা : ইনানীর ধ্বংসস্তূপ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে বিরাজ করছে শোকের এক নিস্তব্ধ পরিবেশ। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ঢাকা, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে এসেছেন অনেকে। তবে মর্গের হিমঘরে রাখা ১০টি লাশ এতটাই পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে যে, চেহারা দেখে শনাক্ত করার কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে নিহত ব্যক্তিদের কয়েকটি পরিবারের ছবি ও পরিচয় প্রকাশিত হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে ১০টি লাশের প্রকৃত পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি। রবিবার সন্ধ্যায় লাশগুলোর ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। পরীক্ষার পর পরিচয় শতভাগ নিশ্চিত হয়েই লাশগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।’

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, লাশগুলো বীভৎসভাবে পুড়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় শনাক্ত করা একেবারেই অসম্ভব। বৈজ্ঞানিক এই পরীক্ষার ফল পেতে কিছুটা সময় লাগতে পারে, তাই স্বজনদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানানো হয়েছে।

যাদের নাম উঠে এসেছে নিখোঁজের তালিকায় : পুলিশ, হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস, জেলা প্রশাসন ও স্বজনদের দেওয়া তথ্য এবং রিসোর্টের এন্ট্রি খাতা অনুযায়ী, নিহত ও নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন-ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) এবং পাঁচ বছর বয়সি শিশু ফায়িজান আহম্মেদ। বাকি ব্যক্তিদের পরিচয় নিশ্চিত হতে ডিএনএ রিপোর্টের পাশাপাশি রিসোর্টের বুকিং রেজিস্টার এবং বেঁচে ফেরা আহত পর্যটকদের দেওয়া তথ্যের ক্রস-ম্যাচিং করা হচ্ছে। শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভ সড়কের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা টুপটুপ রিসোর্টে চা বানাতে গিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার ও জেনারেটরের ডিজেল থেকে এই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। চোখের পলকেই ১০টি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া এই ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর আহমদসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। বর্তমানে রিসোর্টের ম্যানেজার সুমন পুলিশি হেফাজতে থাকলেও মূল মালিকরা এখনো পলাতক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights