ইবোলায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘায়িত, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে আফ্রিকা

অনলাইন ডেস্ক
আফ্রিকায় ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৫ হাজার ৩০০ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে (ডিআর কঙ্গো) প্রাণ হারিয়েছেন ৫ হাজারের বেশি মানুষ। এ ছাড়া কেনিয়া ও উগান্ডায়ও প্রাণঘাতী ভাইরাসটিতে মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া এবং আক্রান্তদের শনাক্ত ও চিকিৎসায় নানা বাধার কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে উঠেছে।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (আফ্রিকা সিডিসি) তথ্যের বরাতে ৩ নভেম্বর আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৩৭৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ডিআর কঙ্গোতে ৫ হাজার ৩৭২ জন এবং কেনিয়া ও উগান্ডায় দুজন করে মারা গেছেন। তিন দেশে মোট ১০ হাজার ৪৪৪ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি মারা যাওয়ায় মৃত্যুহার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি ডিআর কঙ্গোতে ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করা হয়। দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। আফ্রিকার সাম্প্রতিক এই সংক্রমণ আগের যেকোনো ইবোলা প্রাদুর্ভাবের তুলনায় ভৌগোলিকভাবে বেশি বিস্তৃত হয়েছে।

টিকা ও চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা

এবারের প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বান্দিবুগিও প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস। এই প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। ফলে রোগীদের উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে টিকা তৈরির গবেষণায় অগ্রগতি হয়েছে। সম্প্রতি ডিআর কঙ্গোতে পরীক্ষামূলক টিকার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইবোলা সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ফলে জ্বর, দুর্বলতা, বমি, ডায়রিয়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। দ্রুত শনাক্তকরণ, আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণে রাখা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ।

সংক্রমণ শনাক্তে বড় বাধা

ডিআর কঙ্গোর বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি, চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট এবং স্থানীয় মানুষের অবিশ্বাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে রোগী শনাক্ত করা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের অনেকেই অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নিতে কিংবা মৃতদেহ নিরাপদে দাফনের জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের হাতে তুলে দিতে অনিচ্ছুক। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নজরদারির বাইরে থাকা সংক্রমণশৃঙ্খল থেকেও বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। এতে সংক্রমণের উৎস নির্ধারণ এবং কারা কারা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এসেছেন, তা খুঁজে বের করা কঠিন হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি বকেয়া পারিশ্রমিক ও ভাতার দাবিতে কোনো কোনো এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ বন্ধ রেখেছেন। এসব কারণে চিকিৎসা ও সংক্রমণ প্রতিরোধের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

সীমান্ত পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ার উদ্বেগ

ডিআর কঙ্গোর বাইরে কেনিয়া ও উগান্ডাতেও সংক্রমণ ছড়িয়েছে। উগান্ডায় এর আগে ২০ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাঁদের অধিকাংশই ডিআর কঙ্গো থেকে আসা ব্যক্তি ছিলেন। পরে দেশটিকে ইবোলামুক্ত ঘোষণা করা হয়। অক্টোবরে কেনিয়ায় নয়জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। দেশটিতে এর আগে ইবোলা সংক্রমণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়নি। আক্রান্তদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে আফ্রিকা সিডিসির তথ্য জানিয়েছে।

নাইজেরিয়াতেও বিদেশ থেকে আসা এক নারীর শরীরে ইবোলা শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। তবে দেশটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরে সন্দেহভাজন আরও দুজনের নমুনা পরীক্ষা করে সংক্রমণ পায়নি। আক্রান্ত ব্যক্তির ভ্রমণ-ইতিহাস এবং তাঁর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে বিভিন্ন দেশে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে ভাইরাসটির বিস্তার ঠেকানো কঠিন হবে। বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়ানো জরুরি। আফ্রিকার বর্তমান ইবোলা পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্যও বড় পরীক্ষা। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত দেশগুলোর পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তথ্য সূত্র- আলজাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights