গাজীপুরের সমতল ভূমিতে চা চাষ

খায়রুল ইসলাম, গাজীপুর

গাজীপুরের কাপাসিয়ার উর্বর সমতল ভূমিতে চা বাগান করেছেন শৌখিন কৃষি উদ্যোক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. লুৎফর রহমান। পাহাড় কিংবা টিলা ছাড়াও সমতলে চা চাষ সম্ভব, তা প্রমাণ করেছেন তিনি।

অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার তরগাঁও ইউনিয়নের চিনাডুলি গ্রামের প্রায় সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন চা বাগান। প্রায় সাত বছর ধরে নিরলস পরিশ্রম করেন। গত তিন বছর ধরে বাগানের পাতা সংগ্রহ করে অর্থডক্স সবুজ চা তৈরি করছেন। তার বাগানের চা এখন চট্টগ্রাম ও রাজধানীর বেশ কিছু ক্রেতা নিয়মিত কিনে নিচ্ছেন। রাজধানীর উত্তরার ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি) নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগে শিক্ষকতা করছেন অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর চতুর্থ ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি। ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দেশের বৃহত্তম মালনীছড়া চা বাগানে টানা ১৫ বছর কাজ করেছেন। অধ্যাপক লুৎফর কর্মজীবনের শুরুতে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রায় ৩৫ বছর ১৪টি চা বাগানে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেসব চা বাগানের মাটির সঙ্গে কাপাসিয়া অঞ্চলের মাটির গুণগত মানে অনেক মিল খুঁজে পেয়েছেন। তাই দীর্ঘদিন ধরে কাপাসিয়ার পৈতৃক ভূমিতে চা চাষের পরিকল্পনা করে অবশেষে সফল হোন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী ও জামালপুরের সমতল জমিতে চা চাষের ব্যাপক সফলতা দেখে আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। তাই ২০১৯ সালে সিলেট থেকে কিছু চারা এনে প্রাথমিকভাবে সমতল এঁটেল মাটিতে রোপণ করি। আশানুরূপ ফলাফল পেয়ে পর্যায়ক্রমে আরও চারা রোপণ করতে থাকেন। একপর্যায়ে কাপাসিয়ার বানার নদীর তীরবর্তী প্রায় দুই বিঘা বেলে-দোআঁশ মাটির দুটি খেতে চারা রোপণ করেন, যা চমৎকার ভাবে বেড়ে উঠেছে। তিনি জনান, প্রতিটি চারা ২ ফুট দূরত্বে লাগানো হয়েছে। প্রায় ৮ বিঘা জমিতে তিনি ২০ হাজার চারা রোপণ করেছেন। প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে উৎপাদনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একর প্রতি সর্বসাকুল্যে আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকা খরচ হয়। সঠিকভাবে পরিচর্যা করতে পারলে ৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত চা পাতা সংগ্রহ করা যাবে। শুধু কাঁচা পাতা বিক্রি করলেও বছরে এক একর জমি থেকে প্রায় ১ লাখ টাকা বিক্রি করা যায়। চা উৎপাদন করে বিক্রি করলে প্রায় আড়াই লাখ টাকা বিক্রি করা যায়।

তিনি মনে করেন, অন্য কোনো ফসল কিংবা ফল উৎপাদন করে এত বিশাল লাভ আশা করা যায় না। তাছাড়া বাড়ির আঙিনাসহ যেকোনো অনাবাদি এমনকি পতিত জমিতেও চা চাষ সম্ভব। আপাতত তার বাগানের কুঁড়িগুলো দিয়ে সবুজ চা তৈরি করছেন। পাতাগুলো সংগ্রহের পর কয়েক ঘণ্টা ঠান্ডা করে আর্দ্রতা কমে এলে ৫ মিনিট গরম পানিতে সিদ্ধ করে হাতে পিসে গোলাকার গুটি বানানোর পর রোদে শুকানো হয়। এরপরই এগুলো সবুজ চা হয়ে যায়। এভাবে উৎপাদিত চায়ের গুণগত মান অত্যন্ত উন্নত বলে পাইকাররা তার কাছ থেকে প্রতি কেজি চা ১ হাজার টাকায় কিনে নিচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি মাসে ১২-১৫ কেজি চা উৎপাদন হলেও অচিরেই তা ৩০-৩৫ কেজিতে উন্নীত হবে বলে আশা করছেন তিনি। এক সময় তিনি অর্থডক্স বা সিটিসি পদ্ধতিতে ব্যাপকহারে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান। এদিকে এই চা বাগানকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নতুন আশা জেগেছে। দর্শনার্থী নাহিদ ইসলামের মতে, কাপাসিয়ার তরগাঁও ইউনিয়নের চিনাডুলী গ্রামের এই চা বাগানটি এখন স্থানীয়দের কাছে অন্যতম আকর্ষণ। তিনি মনে করেন, এই উদ্যোগ বেকারত্ব দূর করতে বড় ভূমিকা রাখবে। চা বাগানের সুপারভাইজার শরাফ উদ্দিন জানান, প্রতিটি গাছকে ৫ বছর যত্ন করতে হয়। তারপর গাছ বড় হলে পাতা তোলা যায়। একটি চা গাছ গড়ে ৮০ বছর পর্যন্ত উৎপাদন দিতে পারে।

গাজীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মো. আবদুল্লাহ-আল-ফারুক বলেন, ‘কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আমরা পাশে থেকে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। এ ছাড়া একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য এবং তাকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিব। সেইসঙ্গে উনার সাফল্য দেখে অন্য অনেক তরুণ উদ্যোক্তা চা বাগান করার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। এ উদ্যোগ গাজীপুরের কৃষিতে একটি নুতন মাত্রা যোগ করবে। বাড়বে গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ মহিলাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights