দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, বাস্তবতা না দিবাস্বপ্ন
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা অনেকেই সোচ্চার, অথচ সমাজে দুর্নীতি বিদ্যমান। এটাই বাস্তব, এটাই সত্য। পৃথিবীর সব সমাজেই কমবেশি দুর্নীতি আছে। তবে বাংলাদেশে দুর্নীতির মাত্রা অত্যধিক। ২০০১ সালে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) তাদের এক প্রতিবেদনে দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশকে এক নম্বরে স্থান দিয়েছিল। এ নিয়ে সেই সময় তুমুল হইচই হয়েছিল। উল্লেখ্য, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল ২০০১ সালে দুর্নীতির যে ধারণা সূচক প্রকাশ করেছিল, তার ভিত্তি বছর ছিল ২০০০ সাল, যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। দুর্নীতি রাতারাতি সৃষ্টি হয় না এবং তাৎক্ষণিকভাবে তা নির্মূল করাও সম্ভব নয়। পরবর্তী সময়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচকে আরও চার বছর বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানে ছিল। এক সময় বাংলাদেশকে টপকে হাইতি দুর্নীতির ধারণা সূচকে শীর্ষ স্থানে উঠে আসে। তার অর্থ এ নয় যে, বাংলাদেশ দুর্নীতি নিরসনে সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশে দুর্নীতি তারপরও বেড়েছে, তবে অন্য কোনো কোনো দেশ দুর্নীতির ধারণা সূচকে বাংলাদেশকে অতিক্রম করে গেছে। এখনো বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কয়েকটি দেশের অন্যতম। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, দুর্নীতি নামক সামাজিক ব্যাধিতে আমরা আক্রান্ত এবং এ পরিচয় বিশ্বদরবারে আমাদের হেয় করছে; জাতি হিসেবে মর্যাদা ক্ষুণ্ন করছে।
অতীতে কখনো বাংলাদেশের সমাজ সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতিমুক্ত ছিল-এ কথা বলা যাবে না। কম হোক বেশি হোক সমাজে দুর্নীতি সব সময়ই ছিল। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষ দশকে দুর্নীতি এতটা বৃদ্ধি পায় যে, আমরা বিশ্বে শীর্ষস্থানীয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হই। সমাজের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সব স্তরে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। যেন সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্র দুর্নীতির ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এটি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তবে আফসোস করে লাভ নেই। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন এবং বিদ্রোহ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। এ দাবি ইতোমধ্যে উত্থাপিত হয়নি তা নয়। তবে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন আরও শক্তিশালী এবং বেগবান করার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পেয়েছেন। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্বভার লাভ করেছে। চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানের অন্যতম লক্ষ্য ছিল শোষণ-দুর্নীতি এবং সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সরকার নিশ্চয়ই এ সম্পর্কে সচেতন আছে এবং সন্ত্রাস মুক্তির লক্ষ্যে বেশ কিছু দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সংরক্ষিত নারী আসনের একজন সংসদ সদস্যকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে যুক্ত থাকার অভিযোগে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করানো হয়েছে। এগুলো দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমি মনে করি, একই ধারায় এবং একইভাবে দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সরকার যদি সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং দুর্নীতি দমনের লক্ষ্যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে জনগণ তাতে অকুণ্ঠ সমর্থন দেবেন।
দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। দুর্নীতি দমনের দাবি বহুদিনের। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এ দাবি উপেক্ষিত হয়েছে। পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আমলে দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে দুর্নীতিকে আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। সর্বস্তরে দুর্নীতি বিস্তারে সহায়তা করা হয়েছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে কীভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে কিছু মানুষ অঢেল বিত্তবৈভব গড়ে তুলেছিল এবং কীভাবে দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদন থেকে। তাই মনে করি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর এবং কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দেশের সর্বস্তরের মানুষ বর্তমান সরকারকে স্বাগত জানাবে। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার নিশ্চয়ই বিগত সময়ের দুর্নীতির বিষয়ে অবগত আছে। সন্ত্রাস-দুর্নীতি কখনোই দেশের জন্য মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। বর্তমান সরকার অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতি দমনে সচেষ্ট হবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। যদিও কাজটি অত্যন্ত কঠিন। সরকার যদি দুর্নীতি দমনে সফল হতে পারে, তাহলে তাদের অবদান জাতি চিরদিন স্মরণ রাখবে। দেশ ও জাতির কল্যাণ সাধিত হবে এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
তবে এ প্রসঙ্গে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে। সেটি হলো দুর্নীতি কেন হয়? দুর্নীতির কারণ কী? আমাদের দুর্নীতির স্বরূপ সন্ধান করতে হবে। আগেই উল্লেখ করেছি, পৃথিবীর সব দেশ, সব সমাজে কম-বেশি দুর্নীতি বিদ্যমান। সমাজবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দুর্নীতির মূলে রয়েছে প্রধানত অর্থনৈতিক কারণ। প্রায় প্রতিটি দুর্নীতির পেছনেই আর্থিক কারণ যুক্ত থাকে। সমাজে অভাব-অনটন, শোষণ-বঞ্চনা দুর্নীতির জন্ম দেয়। ব্যক্তি যখন তার বৈধ আয় দিয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়, তখন সে অন্যায় জেনেও দুর্নীতির আশ্রয় নিতে পারে। অথবা একজন ব্যক্তি যখন তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয় তখন সে দুর্নীতির পথ খুঁজতে সচেষ্ট হতে পারে। তার অর্থ, দারিদ্র্য সমাজে দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের জন্ম দেয়। এ ছাড়া দুর্নীতির আরও অনেক কারণ রয়েছে। শুধু অভাবই যদি দুর্নীতির মূল কারণ হবে, তাহলে বিত্তবানরা কেন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন? বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের ধনিক শ্রেণি তথা বিত্তবানদের বিরুদ্ধে বিশাল দুর্নীতির প্রমাণ মেলে। আবার অভাব-অনটনের কারণেও যে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে, তারও অনেক উদাহরণ আমাদের সমাজে রয়েছে। বংশগতির কারণেও অনেকে দুর্নীতিতে লিপ্ত হন। অর্থাৎ প্রাচুর্য, দারিদ্র্য, বংশগতিসহ নানা কারণে মানুষ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। যার বিপুল পরিমাণ সম্পদ আছে, তিনি আরও সম্পদ পেতে চান। কিছুু মানুষ আছেন যারা মনে করেন। টাকাই সব। তা কীভাবে অর্জিত হলো সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়। কেউ অভাবের কারণে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, আবার কেউ স্বভাবের কারণে দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়। নীতিহীন মানুষের কারণেই আজ সমাজের এ দুরবস্থা। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি-কীভাবে একশ্রেণির বিত্তবান গোষ্ঠী সরকারি ছত্রছায়ায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিদেশে পাচার করে।
আমাদের সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে সম্পদ ও সুযোগের যথাযথ সুষম বণ্টনের ব্যবস্থা করতে হবে। সম্পদের সুষম বণ্টন খুব সহজ কাজ নয়। এ জন্য প্রয়োজন বড় ধরনের সংস্কার ও কাঠামোগত পরিবর্তন। দিনে দিনে বেলা অনেক হয়েছে। তাই সম্পদ সুষম বণ্টনের জন্য আমাদের আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে থাকা যাবে না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ যাতে সব মানুষের মধ্যে ন্যায্যতার ভিত্তিতে বণ্টন করা যায়, সে ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে ব্যক্তি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে অযৌক্তিক অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। উল্লেখ্য, আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণের মাধ্যমে জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন সাধন। দেশের সম্পদ অযৌক্তিকভাবে যেন মহলবিশেষের হাতে পুঞ্জীভূত না হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম ব্যবহার করে দারিদ্র্য বিমোচনের কর্মসূচি গতিশীল করতে হবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করা না হয়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল উপজীব্য ছিল সমাজ থেকে সব ধরনের বৈষম্য দূরীকরণ। প্রতিটি কর্মীর হাতকে উৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত করতে হবে। বিপুলসংখ্যক কর্মীকে বেকার রেখে কখনোই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি সফল হতে পারে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে বেশ কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বেসরকারি পর্যায়েও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকার দরিদ্র মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের লক্ষ্যে যেসব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে, তা যেন দুর্নীতিমুক্ত থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে।
সমাজে দুর্নীতি ছাড়াও নানা ধরনের নৈতিক অবক্ষয় প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। এগুলো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের যে অবক্ষয় ঘটেছে, তা নিরসনে সর্বস্তরে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। সামাজিক এবং পারিবারিক পর্যায়ে দুর্নীতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং অন্যান্য সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে হবে। নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। একজন নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ সাধারণত দুর্নীতি বা সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকেন। সমাজে আদর্শভিত্তিক নৈতিক শিক্ষার প্রচলন করা গেলে দুর্নীতি অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়।
যে জাতি বুকের রক্ত দিয়ে দেশের স্বাধীনতা সূর্য ছিনিয়ে আনতে পারে, সে জাতি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও জয়ী হবে। এ জন্য প্রয়োজন দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। জনগণ যদি তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, তাহলে তাদের দ্বারা দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা যদি জাতি হিসেবে সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বিশ্বদরবারে টিকে থাকতে চাই তাহলে সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। না হলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বাস্তবতা না হয়ে একটা অধরা দিবাস্বপ্ন হয়েই থাকবে চিরকাল। দেশের যে নাগরিকের রয়েছে দেশপ্রেম, যে আমলার রয়েছে জাতীয় চরিত্র, যে রাজনীতিবিদের রয়েছে সমাজের কাছে অঙ্গীকার-তাদের পক্ষে দুর্নীতিবাজ হওয়া অথবা দুর্নীতিকে আশ্রয়প্রশ্রয় দেওয়া কীভাবে সম্ভব? তাই, আমাদের মধ্যে দেশপ্রেম যত বাড়বে, সমাজ থেকে দুর্নীতি তত কমবে। কারণ, একজন দেশপ্রেমিক মানুষ কখনোই দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারেন না।
♦ লেখক : সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাষ্ট্রদূত। প্রফেসর ইমেরিটাস, ঢা.বি.
