পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের জালে বিরোধী নেতারা, বাড়ছে উদ্বেগ
অনলাইন ডেস্ক
পাকিস্তানে রাজনৈতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও অস্থিরতা নতুন মাত্রা নিয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দমন করতে দেশটির কঠোর ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ ব্যবহারের প্রবণতা তীব্র হচ্ছে। আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে সম্প্রতি একটি বড় ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্তদের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।
১৯৯৭ সালে পাকিস্তানে যখন শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও জাতিগত দাঙ্গা চরম আকার ধারণ করে, তখন দ্রুত বিচারের উদ্দেশ্যে একটি সমান্তরাল আইনি ব্যবস্থা হিসেবে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ চালু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলা এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ঘোষিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’র প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকাগুলো তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। ২০০৭ সালে আত্মপ্রকাশ ঘটে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)-এর, যারা পেশোয়ারের আর্মি পাবলিক স্কুলে ভয়াবহ হামলাসহ দেশজুড়ে একের পর এক প্রাণঘাতী আক্রমণ চালায়।
প্রাথমিকভাবে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিচারে এসব বিশেষ আদালত গঠিত হলেও, সময়ের ব্যবধানে এর পরিধি ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধীদের দমনে এই আইন ব্যবহারের ইতিহাস বেশ পুরনো। ১৯৯৯ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ (বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ভাই) এবং পরবর্তীতে নওয়াজকে উৎখাতকারী জেনারেল পারভেজ মুশাররফও—উভয়েই এই আইনের আওতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন।
পাকিস্তান পুলিশিং ও আইন বিষয়ক গবেষক জোহা ওয়াসিম জানান, এ আইনের মূল সমস্যা লুকিয়ে আছে এর সংজ্ঞায়নে। গত কয়েক দশকে কয়েক দফায় সংশোধনের মাধ্যমে এর আওতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে সন্ত্রাসবাদের পরিধি এতোটাই বিস্তৃত করা হয়েছে যে, অপহরণ, ছিনতাই, অর্থপাচার কিংবা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংস্থাকে সমর্থন করাকেও ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে গণ্য করা যায়।
বর্তমানে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি রয়েছে। ২০২৩ সালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান গ্রেফতার হওয়ার পর তার সমর্থকরা সরকারি রেডিও স্টেশনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে বলে অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনার সূত্র ধরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। ইমরান খান নিজেও বর্তমানে একাধিক সন্ত্রাসবিরোধী মামলার মুখোমুখি। এছাড়া একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী ইসলামিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কাশ্মীরি, পশতু ও বালচ অধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধেও এই কঠোর আইনে মামলা দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক শিরীন মাজারি এই আইনি প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনটির উদ্দেশ্য ও গুরুত্বকে এভাবে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করে হালকা করে ফেলা হচ্ছে। তার মেয়ে মানবাধিকার আইনজীবী ইমান মাজারি ও জামাতা হাদি আলি চাট্টা চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে কারাগারে বন্দি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট ও তথাকথিত ‘সন্ত্রাস ছড়ানোর’ অভিযোগে সন্ত্রাসবিরোধী আদালতে তাদের বিচার চলছে।
আইনটির অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক ব্যবহারে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে দেশটির আইনি কাঠামো ও বিরোধী কণ্ঠরোধের এই প্রবণতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
তথ্যসূত্র : এনপিআর।
